খাদের কিনারে পুঁজিবাজার, বাজেটে প্রণোদনার নামে ‘প্রহসন’

1
1415

বিশেষ প্রতিনিধি : ক্রমাগত ধসের কারণে দেশের পুঁজিবাজার এখন একেবারেই খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। পুঁজি হারিয়ে বিনিয়োগকারীরা হাহাকার করছেন। পড়তে থাকা বাজারের ওপর শেষ ধাক্কা হয়ে এসেছে নতুন অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রস্তাবিত বাজেট।

এবারের বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য প্রণোদনার নামে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, তার প্রভাবে গত কয়েক দিনের ধারাবাহিক দরপতন ঘটেছে। লেনদেন নেমে এসেছে ৩শ কোটির ঘরে। ডিএসইএক্স কমেছে ১শ পয়েন্টের বেশি। বাজেটে পুঁজিবাজারের জন্য প্রণোদনার কথা বলা হলেও নানা কারণে তাকে ‘প্রহসন’ বলছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা।

মূলত কোম্পানির রিজার্ভ ও বোনাস লভ্যাংশের ওপর কর আরোপ করায় শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে মনে করছেন তারা। এই উদ্যোগকে বাজারের স্বার্থ পরিপন্থী বলে আখ্যায়িত করেছেন বিনিয়োগকারীরাও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এ কর প্রস্তাব পাস হলে তালিকাভুক্ত ২০৯টি প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার ৭৯২ কোটি টাকার বাড়তি কর দিতে হবে। এর মধ্যে কোম্পানিভেদে ন্যূনতম ১০০ কোটি থেকে সর্বোচ্চ ৭৬২ কোটি পর্যন্ত কর দিতে হবে। তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যাংককে বাড়তি কর দিতে হবে। যে কারণে ব্যাংকগুলো এই মুহূর্তে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ থেকে বিরত রয়েছে। বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা রয়েছেন সাইডলাইনে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসইর সাবেক এক সভাপতি বলেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানির অনেক উদ্যোক্তাই পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা এই করের প্রস্তাবকে ভালোভাবে নেননি। তাদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ থেকে দূরে রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীরাও আপাতত বাজারে সক্রিয় নন। এমন অনেক উদ্যোক্তা রয়েছেন যার নিজের একাধিক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত রয়েছে।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত একজনের তিনটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৩শ কোটি টাকা কর দিতে হবে। তারা এই আইনের সংশোধন চান। এই প্রেক্ষাপটে বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। যদিও নতুন এই করের প্রস্তাবকে বাজার সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষই ইতিবাচকভাবে নেয়নি।

এদিকে, গত ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর এক মাস পুঁজিবাজার ছিল চাঙ্গা। কিন্তু জানুয়ারির শেষ দিন থেকে শুরু হয় দরপতন। লেনদেনেও চলছে খরা। এর মধ্যে অর্থমন্ত্রী একাধিকবার জানিয়েছেন, বাজেটে তিনি পুঁজিবাজারের জন্য আকর্ষণীয় প্রণোদনা রাখবেন এবং বাজারে সুশাসন ফিরিয়ে আনতে নানা উদ্যোগ নেয়া হবে। কিন্তু তার নতুন প্রস্তাবে বাজার আরো পতনের দিকে ধাবিত হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিজার্ভ ও বোনাস লভ্যাংশের ওপর কর সংক্রান্ত যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা ভুলভাবে উপস্থাপন হয়েছে। রিজার্ভের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব করায় কোম্পানির সম্প্রসারণে অসুবিধা হবে। আবার রিজার্ভ ভাঙার কারণে ভালো কোম্পানির মৌলভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। এছাড়া বোনাস লভ্যাংশের ওপর কর আরোপের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তাও সঠিক হয়নি। যে কারণে শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রবণতা দেখা দিয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বলা হয়েছে, কোনো কোম্পানি বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করলে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে। এছাড়া কোনো কোম্পানির আয় বছরে রিটেইনড আর্নিংস, রিজার্ভ প্রভৃতির সমষ্টি যদি পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি হয়, তাহলে যতটুকু বেশি হবে তার ওপর কোম্পানিকে ১৫ শতাংশ কর দিতে হবে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৩১৭ কোম্পানির মধ্যে ২০৯টির রিটেইনড আর্নিংস ও রিজার্ভের পরিমাণ পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি। কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৭৬২ কোটি টাকা কর দিতে হবে সরকারি কোম্পানি তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনকে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বেক্সিমকো লিমিটেডকে দিতে হবে ৭২২ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশবিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, রিজার্ভ ও বোনাস লভ্যাংশের ওপর কর বসানো বিনিয়োগকারীরা ভালোভাবে নেননি। ফলে বাজেটে শেয়ারবাজারের জন্য দেয়া প্রণোদনাগুলো বাস্তবে উল্টো হয়ে গেছে। রিজার্ভের ওপর কর বসানোয় কোম্পানিগুলো সম্প্রসারণ করতে পারবে না। এতে সরকারও কর কম পাবে। আবার করের কারণে রিজার্ভ ভাঙলে কোম্পানি দুর্বল হয়ে পড়বে।

ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বলেন, রিজার্ভের ওপর কর আরোপের যে প্রস্তাব করা হয়েছে, বিষয়টি পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। বিএসইসির সঙ্গে কথা বলেছি, তারাও উদ্বিগ্ন। আমরা সবাই মিলে অর্থমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব রাখব, বিষয়টির সমাধান হবে।

ডিবিএ সভাপতি শাকিল রিজভী বলেন, রিজার্ভের ওপর কর আরোপ করলে ভালো কোম্পানিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এটা ভুলভাবে উপস্থাপন হয়েছে। কর দেয়ার পরই কোম্পানির অর্থ রিজার্ভে নেয়া হয়। সুতরাং আবার কর দিলে দ্বৈত কর হয়ে যাবে। এছাড়া কোনো কোম্পানির রিজার্ভ ক্যাশ ফর্মে নেই। তাহলে কর কীভাবে দেবে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here