কোম্পানির দক্ষতা, মুনাফা, সুশাসন ও স্বচ্ছতার নীতি দেখে বিনিয়োগ

0
325

দেশের মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রিতে টানা ছয় বছরের রিটার্ন চ্যাম্পিয়ন ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট। এ সাফল্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শহিদুল ইসলাম, সিএফএ, এফআরএম। 

বছরের প্রথম ১০ মাসে এবার প্রথমবারের মতো তাদের ফান্ডগুলোর রিটার্ন ঋণাত্মক। এর নানা দিক জানানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সনদধারী একজন আর্থিক বিশ্লেষক ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপক হিসেবে কথা বলেছেন নিজেদের বিনিয়োগ দর্শন সম্পর্কেও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ সম্পন্ন করে দেড় যুগ আগে বিদেশী ব্যাংকে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন তিনি।

ভিআইপিবির আগে তিনি সিটি ব্যাংক এনএ, আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক, ক্রেডিট এগ্রিকোল ইন্দোসুয়েজ, আইএফসি-এসইডিএফের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় কাজ করেন। সিএফএ সোসাইটি বাংলাদেশের  প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশের পুঁজিবাজারে সনদধারী আর্থিক বিশ্লেষকদের ভূমিকা নিয়েও কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন –মাহফুজ উল্লাহ বাবু।

  •  ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট টানা ছয় বছর মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রির রিটার্ন চ্যাম্পিয়ন। এ সাফল্যের নেপথ্য উপাদানগুলো কী?

প্রথমেই বলে নিই, আমরা কোনো নির্দিষ্ট বছরের জন্য রিটার্নের টার্গেট সেট করে বিনিয়োগ করিনি। চ্যাম্পিয়ন হওয়াও আমাদের টার্গেট ছিল না। এগুলো নিছকই ভালো বিনিয়োগের সুফল হিসেবে এসেছে।

শুরু থেকেই আমরা খাঁটি ভ্যালু ইনভেস্টমেন্টের দর্শন নিয়ে বিনিয়োগ করছি। আমরা মূলত কোম্পানিটির অন্তর্নিহিত মূল্য বোঝার চেষ্টা করি। বিদ্যমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে ভালো কোম্পানিগুলোর ব্যবসা পর্যালোচনা করে আমরা যদি দেখি, তাদের প্রবৃদ্ধি, ব্যবসার দক্ষতা, মুনাফা, লভ্যাংশ দেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে এবং কোম্পানিগুলো করপোরেট সুশাসন ও স্বচ্ছতার নীতিগুলো অনুসরণ করে, কেবল তাহলেই আমরা সেসব কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করি।

অবশ্যই যৌক্তিক দামে, সম্ভব হলে কম দামে কেনার চেষ্টা করি। বিনিয়োগের কয়েক দিন পরই আমরা অল্প কিছু মুনাফার জন্য শেয়ার বেচে দিই না। এ বিনিয়োগ দীর্ঘ সময়ের জন্য। সঠিক কোম্পানি পিক করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে রিটার্নও হয় বড়। কারণ ভালো কোম্পানি বছরের পর বছর ধরে ভ্যালু ক্রিয়েট করে। কোম্পানির ম্যানেজমেন্ট এ কাজে সফল হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারে এর শেয়ারের চাহিদা ও দাম বাড়ে। বছর বছর আকর্ষণীয় লভ্যাংশের পাশাপাশি আমরা সন্তোষজনক মূলধনি মুনাফা পাই।

২০১১ থেকে গত বছর পর্যন্ত টানা সাত বছর এ স্টাইলের বিনিয়োগ থেকেই সর্বোচ্চ রিটার্ন এসেছে। ধৈর্য নিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য শেয়ার ধরে রাখার কৌশলটি এদেশে খুব জনপ্রিয় নয়। হয়তো এ কারণেই আমাদের রিটার্ন অন্য অনেকের চেয়ে বেশি ছিল।

ভালো রিটার্ন জেনারেট করতে আরেকটি বিষয় আমাদের সহায়তা করেছিল, তা হলো অ্যাসেট ক্লাস ডাইভারসিফিকেশন। দেশে এর সুযোগ খুবই কম। তার পরও আমরা সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ থেকে ভালো রিটার্ন পেয়েছিলাম। সম্ভবত, অ্যাসেট ম্যানেজার হিসেবে আমরাই প্রথম দেশের সরকারি বন্ডে বড় বিনিয়োগ করেছিলাম। পরবর্তী সময়ে আরো কিছু ফান্ডও বিনিয়োগ করে।

আমরা যখন মিউচুয়াল ফান্ডের অর্থ বিভিন্ন সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করি, তখন সেগুলোর ইল্ড ভালো ছিল। এর আয় আমাদের ইউনিটহোল্ডারদের ভালো লভ্যাংশ দিতে সাহায্য করে। কয়েক বছর পর আস্তে আস্তে ইল্ড কমে আসতে থাকে। ১১-১২ শতাংশ থেকে ইল্ড যখন ৬-৭ শতাংশে নেমে আসে, তখন আমরা সেখান থেকে বিনিয়োগ তুলে নিই এবং যথেষ্ট মূলধনি মুনাফা পাই। আপনারা জানেন, বন্ডের ইল্ড কমলে দাম বাড়ে আর ইল্ড বাড়লে দাম কমে যায়।

ব্যয় নিয়ন্ত্রণও আমাদের পারফরম্যান্স বাড়াতে ভূমিকা রাখে। আমরা মিউচুয়াল ফান্ড গঠনের সময় খরচ সর্বনিম্নে রাখার চেষ্টা করি। আপাতচোখে মনে হতে পারে, ফান্ডের এ খরচগুলো খুব বড় ব্যবধান গড়ে দেয় না। তার পরও মনে রাখতে হবে, এ খরচ ফান্ডের মেয়াদজুড়েই অ্যামর্টাইজড হয়। নেগোশিয়েট করে আমরা ট্রাস্টি ও কাস্টডিয়ানের ফিও কমানোর চেষ্টা করি। ব্রোকারেজ ফি বাবদ খরচ নিয়ন্ত্রণে আমরা স্বল্পমেয়াদি লেনদেন এড়িয়ে চলি।

আমি বিশ্বাস করি, ভ্যালু ইনভেস্টমেন্টের দর্শন-কৌশলে অনড় থাকায় বাজার পরিস্থিতি নির্বিশেষে আমরা ভালো রিটার্ন জেনারেট করতে সক্ষম হই। সাত বছরের চিত্র বলছে, ডিএসইর সূচকে হ্রাস-বৃদ্ধি যাই হোক, দেশের মিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রির রিটার্ন পজিটিভ ছিল। ইন্ডাস্ট্রির গড় রিটার্নের চেয়ে আমরা প্রতি বছরেই শতকরা ৬-১০ পয়েন্ট এগিয়ে ছিলাম।

এখানে প্রতিষ্ঠানের স্ট্রাকচারও একটি সহায়ক বিষয় ছিল। ভিআইপিবি অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির টিমে সবাই দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার হিসেবে সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে বেছে নিয়েছে। আমার প্রায় এক দশক হয়ে গেল। আমরা এ কাজটিই করে যেতে আগ্রহী।

নতুন নতুন চাকরি খোঁজার বদলে আমাদের পুরো ফোকাস থাকে এক্সিলেন্ট ইনভেস্টমেন্টের সুযোগ খোঁজায়। ম্যানেজমেন্টের মতো আমাদের পর্ষদও দীর্ঘমেয়াদি ভ্যালু ইনভেস্টমেন্টে বিশ্বাসী। তারা ম্যানেজমেন্টকে নিজ কাজে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছে। সাপোর্টও দিচ্ছে। ইউনিটহোল্ডারদের পাশাপাশি আমরা শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও ভ্যালু ক্রিয়েট করছি। তবে এ বছরটি আমাদের জন্য কিছুটা প্রতিকূল যাচ্ছে।

  • ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত আপনাদের ফান্ডগুলোর সম্পদমূল্য কত শতাংশ কমেছে

নিশ্চয়ই। বছরের প্রথম ১০ মাসে স্টক এক্সচেঞ্জের সূচকগুলো ১৫-১৬ শতাংশ কমেছে। ২০১৮ সালের বাজারে সবচেয়ে বেশি সাফার করছে ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলো। ওয়েবসাইটে দেয়া পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট দেখলে বুঝবেন, আমাদের পুরো ইকুইটি পোর্টফোলিওটিই ব্লু-চিপ শেয়ার দিয়ে সাজানো। প্রথমবারের মতো কোনো বছরে আমাদের ফান্ডগুলোর রিটার্ন ঋণাত্মক। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এ হার ১১ শতাংশের মতো। আমরা মার্কেটকে বিট করেছি, তবে ইয়ার টু ডেট রিটার্ন এখনো নেগেটিভ। বাকি দুই মাস কী হয় দেখা যাক।

  •  বছর ব্লুচিপ শেয়ারগুলোই সবচেয়ে বেশি সাফার করছে কেন?

টানা অনেক বছর উচ্চহারে পজিটিভ রিটার্ন জেনারেট করার পর এক-দুই বছরে বিরতি কোনোভাবেই অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমি বিষয়টিকে কারেকশন হিসেবে দেখতে চাই।

এ বছর ডিএসই, সিএসইর ব্লু-চিপ সূচক বেশি কমার একটি বড় কারণ, বিদেশীদের শেয়ার বিক্রি। আমরা যেসব শেয়ার হোল্ড করছি, বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এসব কোম্পানিতেই বেশি বিনিয়োগ করে থাকেন। এ বছর উন্নত বিশ্বের ফান্ডগুলো সব ফ্রন্টিয়ার্স মার্কেট থেকেই কিছু মূলধন তুলে নিয়েছে।

নিজেদের দেশে সুদের হার বৃদ্ধির কারণে সেখানে তাদের তহবিলগুলো আগের মতো সহজলভ্য নয়। এর চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে, আমাদের মতো দেশগুলোর মুদ্রার বিপরীতে ডলারের শক্তি বৃদ্ধি। একটি দেশে বিনিয়োগ করার পর সেখানকার মুদ্রার মান যদি বেশি কমে যায়, তাহলে ডলারে বিদেশী ফান্ডের সম্পদমূল্য কমে যায়। তাই তারা সাধারণত কিছু ফান্ড তুলে নিয়ে এ ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখে।

  • ২০১৮ সালের বাজারে কোনো বিনিয়োগকারীই কি পজিটিভ রিটার্ন করছেন না?

দুই ধরনের বিনিয়োগকারী এ বছর পজিটিভ রিটার্ন  জেনারেট করে থাকতে পারেন। প্রথমত, ২০১৭ সালের শেষ দিকে শেয়ারে যাদের এক্সপোজার কম ছিল বা এ বছর যারা নতুন বিনিয়োগ আনছেন। দ্বিতীয়ত, যারা বর্তমান বাজারের ট্রেন্ডি শেয়ারগুলোয় বিনিয়োগ করছেন।

আমরা দেখছি, ২০১৮ সালের বাজারে নন ব্লু-চিপ বা দুর্বল মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর শেয়ারই বেশি ট্রেন্ডি। কিছু কোম্পানির মৌলভিত্তি ভালো হচ্ছে না, তা বলব না। তবে তাদের ডিসক্লোজার, স্বচ্ছতা ও সুশাসন সম্পর্কে আমরা কনফিডেন্ট না। তাই আমরা সেগুলোয় বিনিয়োগ করছি না। সাময়িক প্রতিকূলতায় আমরা ভ্যালু ইনভেস্টমেন্টের পূর্বনির্ধারিত দর্শন আর কৌশল থেকে সরে আসিনি। আর ২০১৭ সালের শেষ দিকে আমাদের ইকুইটি এক্সপোজার তুলনামূলক বেশি ছিল। নয়তো আমাদের রিটার্ন আরেকটু বেটার থাকত।

যাই হোক, ভ্যালু ইনভেস্টর হিসেবে আমরা নির্দিষ্ট একটি বছরের মার্কেট পারফরম্যান্স নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমরা আমাদের হোল্ডিংয়ের প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী। আমরা জানি, আমাদের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ভালো চলছে। দীর্ঘমেয়াদে তারা ভ্যালু ক্রিয়েট করবে। শেয়ারের দামে কিছুটা সংশোধন হলেও তারা লভ্যাংশ কিন্তু ঠিকই দিয়ে যাচ্ছে।

আমরা বিশ্বাস করি, বাজার পরিস্থিতি স্বল্পমেয়াদে আমাদের প্রতিকূলে থাকলেও একসময় সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। যে কোম্পানিগুলো তাদের ইন্ডাস্ট্রির প্রতিযোগিতায় ভালো করছে, তাদের ব্যবসায় প্রবৃদ্ধি ভালো, মুনাফা মার্জিন ভালো, ইপিএস ও লভ্যাংশে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত, সেসব কোম্পানি ক’দিন আগে আর পরে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করবেই। সবকিছু আকর্ষণীয় থাকলে কোনো কোম্পানি সাসটেইনেবলি মার্কেট ক্যাপিটাল হারাতে পারে না। 

  • আরো ফান্ড আনছেন না কেনমিউচুয়াল ফান্ড ইন্ডাস্ট্রিকে জনপ্রিয় করতে করণীয়-

অনেকেই এ কথাটি বলেন। দেখুন, আমরা বিশ্বাস করি সাসটেইনেবিলিটির জন্য ধীরে ধীরে এগোনোই ভালো।

বর্তমানে আমরা দুটি মেয়াদি ও দুটি বেমেয়াদি ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনার কাজ করছি। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৩ শতাংশ রিটার্ন জেনারেট করে আমরা ইউনিটহোল্ডারদের ১২-১৩ শতাংশ হারে নগদ লভ্যাংশ দিতে সক্ষম হয়েছি। শুধু লভ্যাংশের কথা বললেও দেখবেন, ঝুঁকি সমন্বিত এ রিটার্ন দেশের অন্য যেকোনো অ্যাসেট ক্লাসের তুলনায় বেশি। তার ওপর দীর্ঘমেয়াদে এনএভি রিটার্ন। বিনিয়োগকারীরাও এটিকে উৎসাহিত করছেন। সার্বিকভাবে বাজারে মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর ইউনিট অনেক ডিসকাউন্টে লেনদেন হচ্ছে। আমাদের দুটি ফান্ড সম্পদমূল্যের কাছাকাছি দামেই হাতবদল হয়।

বিনিয়োগকারীরা চাইলে আগামীতে আমরা নিশ্চয়ই আরো ফান্ডের সম্পদ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেব।

  • আপনি দেশের সিএফএ সোসাইটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্বও পালন করছেন। সিএফএ সনদ আরআপনাদের সংগঠন সম্পর্কে জানাবেন

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সিএফএ ইনস্টিটিউট নির্দিষ্ট কারিকুলামের ভিত্তিতে পরীক্ষা নিয়ে বিশ্বের ইনভেস্টমেন্ট প্রফেশনালদের চার্টার্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) সনদ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে আমরা কিছু প্রফেশনাল এ সনদ অর্জন করেছি। বছর তিনেক আগে যখন বাংলাদেশের সিএফএদের সোসাইটি গড়ে তুলি, তখন সদস্য সংখ্যা ছিল ৪০-৫০ জনের মতো। এখন সংখ্যাটি ১০০ এর কাছাকাছি। প্রতি বছর দেশ থেকে ৫০০-৬০০ জন সিএফএ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

সিএফএ ইনস্টিটিউট ইনভেস্টমেন্ট প্রফেশনালদের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্লাটফর্ম। তারা সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ও স্কিল বাড়ানোর ওপর যতটা গুরুত্ব দেয়, ফান্ড ম্যানেজমেন্ট পেশায় নৈতিকতা সম্পর্কেও ততটাই গুরুত্ব দেয়। দেশের বাজারেও দেখবেন, ইনস্টিটিউটের সদস্যরা পরিচ্ছন্ন বিনিয়োগ ও গ্রাহকসেবায় নৈতিকতা প্রমোট করেন।

সিএফএ সোসাইটি থেকে আমরা সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়নে যেমন বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করি, তেমনি ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ শিক্ষার প্রসারেও কাজ করে চলেছি। সর্বোপরি, আমাদের বাজারটির উন্নয়নে বিভিন্ন করণীয় সম্পর্কে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্টক এক্সচেঞ্জসহ সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করছি।

ফিন্যান্স প্রফেশনে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের জন্যও আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করি। সিএফএ ইনস্টিটিউটের রিসার্চ চ্যালেঞ্জ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি চমৎকার প্রতিযোগিতা। বাংলাদেশ থেকে বিজয়ী টিমগুলো আঞ্চলিক পরিসরে প্রতিযোগিতা করতে যায়।

সিএফএ সনদের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকটি হলো, এ সনদ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। বাংলাদেশের সিএফএরা সরাসরি চাকরি নিয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয় কাজ করতে যাচ্ছেন। একাগ্রতা থাকলে এ সনদ অর্জন করা খুব কঠিন নয়।

উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এমবিএ করার চেয়ে অনেক কম খরচ হয় সিএফএ প্রোগ্রাম শেষ করতে। তাই আমরা আমাদের অনুজদের এই ফিল্ডে উৎসাহিত করছি। আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তিরও ব্যবস্থা রয়েছে ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে। ফিন্যান্সিয়াল মিডিয়া, একাডেমিয়া ও রেগুলেটরি বডির সদস্যদের জন্যও আলাদা ব্যবস্থা করেছে সিএফএ ইনস্টিটিউট।

  • সনদধারী বিশ্লেষকদের কাছ থেকে শুনিদেশের বাজারে অ্যাসেট ক্লাসের সংখ্যা কম থাকায় পেশাদার বিনিয়োগকারীদের প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়

ঠিকই বলেছেন। সারা বিশ্বেই বিভিন্ন অ্যাসেট ক্লাসের সমন্বয়ে একেকটি ভালো পোর্টফোলিও গঠন ও ম্যানেজ করা হয়। আমাদের এখানে ইকুইটির বাইরে সুযোগ খুব সীমিত। সরকারি বন্ড আছে, কিন্তু সেগুলো হাতবদল করার সুবিধা যথেষ্ট নয়। বেসরকারি খাতেও এখন প্রচুর বন্ড ইস্যু হচ্ছে, তবে প্রায় পুরোটাই প্রাইভেট প্লেসমেন্টে।

ফিক্সড ইনকাম সিকিউরিটিজের একটি সেকেন্ডারি বাজার গড়ে তোলা আমাদের জন্য আশু প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি আরো আগেই হওয়া দরকার ছিল। বন্ড বাজার দাঁড় করানোর আগে ডেরিভেটিভ নিয়ে ভাবনা খুব ফলপ্রসূ কিছু হবে বলে আমার মনে হয় না। ধাপে ধাপে এগোনোর একটি বিষয় রয়েছে। তবে উন্নত বাজারের জন্য আমাদের দুটোই দরকার।

  • দেশে কার্যকর বন্ড বাজার গড়ে উঠছে না কেনআপনি কী মনে করেন?

বিভিন্ন সময়ে কয়েকটি বন্ড স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে। আমি দেখেছি, এগুলোয় বিনিয়োগকারীরা কিন্তু ইল্ড নিয়ে সন্তুষ্ট। তার পরও বন্ডের বাজার গড়ে উঠছে না কেন— এমন প্রশ্ন আমারও। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি খুব দরকার।

আমি একটি পয়েন্ট উল্লেখ করতে পারি, সঞ্চয়পত্রের মতো শূন্য ঝুঁকির সিকিউরিটিজে যখন ১১-১২ শতাংশ রিটার্ন পাওয়া যায়, সেখানে বিনিয়োগকারী হিসেবে আমি তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির করপোরেট বন্ডগুলো থেকে তার চেয়ে কয়েকশ ভিত্তি পয়েন্ট বেশি সুদ আশা করব— এটিই স্বাভাবিক।

আবার ইস্যুয়ারের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবুন, ১২-১৫ শতাংশ সুদ দিয়ে বড় আকারের মূলধন সংগ্রহ করলে তারা কত টাকার ব্যবসা করতে পারবেন, আর সে ব্যবসা থেকে বন্ডের অর্থ ফেরত দিতে পারবেন? সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে আনাটা অর্থনীতির জন্য খুব জরুরি।

দেখুন, আমাদের সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে যে বড় আকারের তহবিল সংগ্রহ করছে, তার সুদ পরিশোধেও বাজেটের একটি বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে। ফিসক্যাল ডিসিপ্লিনের জন্যও এটি কমিয়ে আনতে হবে। নীতিনির্ধারকরা মাঝে মাঝে বলছেনও কথাগুলো। মানছি, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের কিছু সীমা বেঁধে দেয়া আছে। তার পরও মোট ফিগারগুলো মানি মার্কেটকে প্রভাবিত করার জন্য যথেষ্ট।

  • আপনি কি মনে করেনআগামী দিনগুলোয় সঞ্চয়পত্রের সুদ কমিয়ে আনা হবে?

হ্যাঁ। আমি তাই বিশ্বাস করি। হয়তো নির্বাচনের আগে হবে না। তবে নির্বাচনের পর এটি কমিয়ে আনার সম্ভাবনাই বেশি। তেমনটি হলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পোদ্যোগে অর্থসংস্থান যেমন সহজ হবে, তেমনি পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং সিস্টেমে তারল্যপ্রবাহও অনেক বাড়বে।

  • আমাদের পাঠকদের জন্য কিছু সেক্টরাল আউটলুক শেয়ার করবেন

মোটাদাগে দেখলে দেশের ওষুধ শিল্প ও এফএমসিজি খাতের আউটলুক বেশ পজিটিভ। এসব খাতের ভালো কোম্পানিগুলোর শেয়ার আমরা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রেখেছি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত নিয়ে কিছু সতর্কতা রয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এক্ষেত্রে আমরা পুরো ইন্ডাস্ট্রি থেকে বেছে বেছে কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ার হোল্ড করছি, যারা শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ সমুন্নত রেখে ব্যবসাটি এগিয়ে নেবেন বলে আশা করা যায়।

  •  সেকেন্ডারি বাজার কেমন যাবে বলে আশা করছেন?

দেখুন, সেকেন্ডারি বাজারের খুঁটিনাটি নিয়ে আমরা বেশি পরিশ্রম করি না। তবে যেহেতু এ বাজারেই শেয়ারগুলো কেনাবেচা করতে হয়, সেহেতু এর গতিবিধিও নজরে রাখতে হয়।

আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলব, খুব খারাপ কিছুর আশঙ্কা অবশ্যই করছি না। সঞ্চয়পত্রের সুদ কমলে সেকেন্ডারি বাজারে তারল্যপ্রবাহ অনেক বাড়বে। পরিশেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই, সেকেন্ডারি বাজারে দীর্ঘমেয়াদে কোনো শেয়ারের দামই এর ভ্যালু থেকে বেশি দূরে থাকবে না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here