বিশেষ প্রতিনিধি : কেয়া গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠান। গত ২০ আগস্ট দুদকের মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন বিতর্কিত ব্যবসায়ী আবদুল খালেক পাঠান। ২০০৮ সালে শেয়ার নিয়ে গুজব ছড়িয়ে সাড়ে ৫ কোটি টাকা গুনেছেন জরিমানা। এরপরে চলতি বছরে কৃষি ব্যাংক থেকে ১১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলায় খালেক পাঠানকে গ্রেপ্তার করা হলে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

কেয়া গ্রুপটির কাছে পূবালী ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৫৬৭ কোটি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬৬ কোটি টাকা, এরই মধ্যে যা খেলাপি হয়েছে। অন্যদিকে সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের হাজার কোটি টাকা ঋণে ধুঁকছে প্রতিষ্ঠানটি। কয়েক বছর ধরে সাউথইস্টসহ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ গ্রহণ ও তা পরিশোধ না করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন খালেক পাঠান।

২০১৩ সালে কেয়া গ্রুপের কাছে সাউথইস্ট ব্যাংক ব্যাংকটির ৩৭৩ কোটি টাকা ঋণ থাকলেও ২০১৬ সাল শেষে তা প্রায় হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এরসঙ্গে পুবালী ব্যংকের ৫৬৭ কোটি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬৬ কোটি এবং কৃষি ব্যাংকের ১১১ কোটি টাকা মিলে ১৯৪৪ কোটি টাকা। এরসঙ্গে অন্যান্য ব্যাংকের আরো ঋণ দিলে ২ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

কেয়া গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠান

ব্যাংকসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, ২০১২ সাল থেকেই ঋণ পরিশোধে অনিয়মিত হয়ে পড়ে কেয়া গ্রুপ। ২০১৫ সালে ৮৭৯ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠনের সুযোগ নেন গ্রুপের কর্ণধার আবদুল খালেক পাঠান। পুনর্গঠিত ঋণও খেলাপি হয়ে পড়লে তা আদায়ে মামলার আশ্রয় নেয় একাধিক ব্যাংক। যদিও সাউথইস্ট ব্যাংক অর্থ আদায়ে মনোযোগী না হয়ে উল্টো উদার হস্তে অর্থায়ন করে গেছে গ্রুপটিকে।

সাউথইস্ট ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর শেষে কেয়া গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির ৩৭৩ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ২৯৬ কোটি টাকা ছিল ফান্ডেড ও ৭৭ কোটি টাকা নন-ফান্ডেড। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেষে গ্রুপটির কাছে সাউথইস্ট ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯৬ কোটি টাকা।

২০১৫ সাল শেষে কেয়া গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির ঋণ আরো বেড়ে ৫৯১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২০১৬ সালে অস্বাভাবিক হারে কেয়া গ্রুপকে ঋণ দেয় সাউথইস্ট ব্যাংক। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে আবদুল খালেক পাঠানের মালিকানাধীন কেয়া গ্রুপের কাছে ব্যাংকটির ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯১২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ৩৫১ কোটি ও নন-ফান্ডেড ঋণ রয়েছে ৫৬১ কোটি টাকার বেশি। ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় গ্রাহক এখন কেয়া গ্রুপই।

সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল হোসেন বলেন, কেয়া গ্রুপ আমাদের সবচেয়ে বড় গ্রাহক। টাকা যেহেতু দিয়ে দেয়া হয়েছে, তাই ধীরে ধীরে তা আদায় করতে হবে। রাতারাতি গ্রুপটির কাছ থেকে অর্থ আদায় করা সম্ভব নয়। তবে কেয়ার কাছ থেকে টাকা আদায়ে বিশেষ পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। অতীতের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আগামীতে বড় বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

কৃষি ব্যাংকের ১১১ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদকের দায়ের করা মামলায় গত মাসে গ্রেফতার হন আবদুল খালেক পাঠান। দুদকের মামলায় গত বৃহস্পতিবার আবদুল খালেক পাঠান জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. নুর হোসাইন। এর আগে ২০০৮ সালে শেয়ার কারসাজির সঙ্গে সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়েও বিতর্কিত হন আবদুল খালেক পাঠান। গুজব ছড়িয়ে শেয়ারের দাম বাড়ানোর দায়ে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা জরিমানা করে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।

কেয়া গ্রুপের কাছে বড় অংকের ঋণ রয়েছে পূবালী ও ন্যাশনাল ব্যাংকেরও। গ্রুপটির কাছে পূবালী ব্যাংকের ঋণের পরিমাণ ৫৬৭ কোটি ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ২৬৬ কোটি টাকা, এরই মধ্যে যা খেলাপি হয়েছে।

জামিনে মুক্তি পাওয়ায় কেয়া গ্রুপের কর্ণধারের কাছ থেকে অর্থ আদায় প্রক্রিয়া সহজ হবে বলে জানান পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবদুল হালিম চৌধুরী। তিনি বলেন, আবদুল খালেক কারাগারে থাকলে কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। তখন ব্যাংকের টাকা আদায় আরো কঠিন হবে।

তবে আবদুল খালেক পাঠানের সেলফোনে সোমবার একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

গত বছরের জুন শেষে কেয়া গ্রুপের কাছে সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ঋণের স্থিতি ছিল ৭৫ কোটি টাকা। অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে গ্রুপটির কাছে ব্যাংক এশিয়ার ঋণের পরিমাণ ১৫ কোটি ৬১ লাখ, স্ট্যান্ডার্ডের ১৩ কোটি ৬০ লাখ, প্রিমিয়ারের ৮ কোটি, ডাচ্-বাংলার ২ কোটি ও সোনালী ব্যাংকের ১৩ কোটি টাকা। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন ক্যাপিটালেরও ২৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে কেয়া গ্রুপে।

সব মিলিয়ে আবদুল খালেক পাঠানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ঋণ থাকলেও এর অর্ধেকই সাউথইস্ট ব্যাংকের। ব্যাংকটির একক গ্রাহক হিসেবেও শীর্ষে রয়েছে কেয়া গ্রুপ। গত ৩১ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, সাউথইস্ট ব্যাংকের শীর্ষ ২৯ গ্রাহকের কাছে ঋণ রয়েছে ৮ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা।

কেয়া গ্রুপের কাছে থাকা ঋণের পরিমাণ চলতি বছর কিছুটা কমে এসেছে বলে জানান সাউথইস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল হোসেন। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ঋণ রয়েছে ৮৫০-৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ফান্ডেড ঋণ ৩০০ কোটি টাকার কিছু বেশি। নন-ফান্ডেড ঋণ স্বল্পমেয়াদি হওয়ায় ঋণপত্র নিষ্পত্তি হলে তা আদায় হয়ে যাবে।

চলতি বছরের জুন শেষে সাউথইস্ট ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৯ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। একই সময়ে ৯৫৩ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে, যা ব্যাংকটির বিতরণকৃত ঋণের ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। ২০১৬ সালের জুনে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৭৭১ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৮২ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বাড়ায় বেশি হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে সাউথইস্ট ব্যাংককে।

ফলে কমেছে ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ। ২০১৬ সালে সাউথইস্ট ব্যাংক নিট মুনাফা করে ২৪৩ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির চার বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০১৫ সালেও ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ৩০৬ কোটি টাকা। এর আগে ২০১৪ সালে ৩৮৩ কোটি ও ২০১৩ সালে ৩৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে সাইথইস্ট ব্যাংক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here