কেনার সময় জিততে না পারলে বিক্রিতে জেতা অসম্ভব

10
2492

নতুন কোম্পানির শেয়ার অন্তর্ভূক্তির দিনেই বাজার অস্থিতিশীল হয় এবং হবে। এমন নিয়মের এবারও কোন পরিবর্তন ঘটেনি। দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিটি কোম্পানির শেয়ারই বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক প্রত্যাশা সৃষ্টি করে বাজারে আসে। দুই-চার দিন রাজত্ব করেই তাদের সঞ্জিবনী শক্তি নিঃশেষিত হয়।

প্রত্যাশার বেলুন মাঝ আকাশে বার বার ফুটো হয়। তারপরেও যাবার পরেও আমাদের বোধদয় হয় না। ন্যাড়া এক বারের বেশি বেলতলায় যা্য়। তবে কিছু ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর অতি উৎসাহ ঘটনার পুনরাবৃত্তি করেন, ন্যাড়া আবারো বেলতলায় যান। পূঁজি হারিয়ে হা-হুতাস করেন।

কোন শেয়ারের দাম বাড়তে দেখলেই ক্ষদ্র বিনিয়োগকারীরা অস্থির হয়ে পড়েন। হাতে ক্যাশ নাই; অন্য শেয়ার বিক্রি করে কার আগে কে-কিনবে, নতুন শেয়ার বগলদাবা করবে- সেই প্রতিযোগীতায় ব্যস্ত। ফলে পুরনো শেয়ারের মূল্য পতন আর নতুন শেয়ারের উর্ধগতি; দুটোই হয় লাগাম ছাড়া। ফলাফলও হয় পূর্বনির্ধারিত।

টাকার হিসেবে লেনদেন বাড়লেও ইনডেক্সের হয় বড় পতন। একই নাটক আমরা এবারও মঞ্চস্থ হতে দেখলাম, আমান ফিডে।

অসচেতনার কিছু দিক তুলে ধরা হলো-

একটি শেয়ার থেকে বিনিয়োগকারী নূন্যতম ১০% মুনাফা করতে চায়। এখন ১০% লসে এক শেয়ার বিক্রি করে অন্য শেয়ার থেকে ১০% মুনাফা করতে হলে আপনাকে আসলে মোট ২০% এর বেশি মুনাফা করতে হবে। যাতে আগের ১০% ক্ষতি কাটিয়ে ১০% মুনাফা হয়। এর সাথে যোগ হবে তিন বার বিক্রয়-ক্রয়-বিক্রয় করার ব্রোকার কমিশন। নতুন একটি শেয়ার থেকে অল্পদিনে ২০-২২% লাভ করা সবার পক্ষে অসম্ভব। যদি না আপনি তুলানামূলক কম দামে প্রথম দিকেই শেয়ায়রটি কিনতে না পারেন।

  • কোম্পানির পরিচালকরা এতটা বোকা নয় যে, তারা নিজেদের লাভ বুঝতে পারবেন না। তারা যেখানে ইস্যু মূল্যে নিজ কোম্পানির শেয়ার আইপিওতে বিক্রি করে দিয়েছে, সেখানে ইস্যু মূল্যের ২/৩ গুন বেশি দামে সেকেন্ডারী মার্কেট থেকে শেয়ার কিনে আপনি কতটা লাভ করতে পারবেন?
  • শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ মানেই ঝুঁকি গ্রহণ। কতটুকু ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য এই মাত্রা জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকে অযৌক্তিক মূল্যে নতুন শেয়ার কেনেন এবং বিপদে পড়েন।

অসচেতনতার মূলে রয়েছে আমাদের কোন শেয়ারর অন্তরনিহীত মূল্য (Intransic Value) যাচাই করতে না পারার অক্ষমতা। কোন শেয়ারর অন্তরনিহীত মূল্য যাচাই করা কষ্টসাধ্য কাজ কিন্তু অসম্ভব নয়। ১৫-২০ মিনিটের চেষ্টায় আপনি কোন শেয়ারর অন্তরনিহীত মূল্য সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। যত অনুশীলন করবেন ততই নির্ভূল হবে আপনার ধারণা। কাজটি আপনি করতে পারেন দুই ভাবে-

  • কোম্পানির ফান্ডামেন্টাল এনালাইসিস করে।
  • রিলেটিভ মার্কেট এনালাইসিস করে।

ফান্ডামেন্টাল এনালাইসিস : নতুন কোম্পানি লেনদেনের ২/১ দিন আগে অথবা শুরুর দিনেই তাদের সর্বশেষ আয় প্রকাশ করে। সেখান থেকে NAV ও EPS এর তথ্য সংগ্রহ করুন। এবার EPS থেকে বাৎসরিক EPS হিসেব করুন,সাধারণ ঐকিক নিয়মেই এটা করা সম্ভব। এবার বাৎসরিক EPS থেকে PE হিসেব করে ফেলুন।

৩ মাসের EPS * ৪ = বাৎসরিক EPS
৬ মাসের EPS * ২ = বাৎসরিক EPS
৯ মাসের EPS * ১.৩৩ = বাৎসরিক EPS

PE = Market Price /Annual EPS

ভ্যালু ইনভেস্টমেন্টের জনক ব্যাঞ্জামিন গ্রাহাম (তিনি আবার বিনিয়োগ গুরু ওয়ারেন বাফেটের শিক্ষক) বলেন, একটি শেয়ার তখনি বিনিয়োগ করবেন, যখন নিচের দুটি শর্ত পূরণ হবে-

  • শেয়ার মূল্য NAV এর ১.৫ গুণ বা তার কম।
  • শেয়ার মূল্য বাৎসরিক EPS এর ১৫ গুণ বা তার কম।

অর্থাৎ ব্যাঞ্জামিন গ্রাহামের মতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগযোগ্য মূল্য হতে পারে Square Root (1.5*NAV*15*EPS) = Square Root (22.5*NAV*Yearly EPS)

উদাহরণ স্বরূপ : ২০ টাকা NAV ও ৩ টাকা বাৎসরিক EPS এর একটি কোম্পানির সর্বোচ্চ বিনিয়োগযোগ্য মূল্য সীমা Square Root (22.5*20*3) = ৩৬.৭ টাকা। ৩৬.৭ এর চাইতে যত বেশি দামে আপনি ঐ শেয়ার কিনবেন, আপনার বিনিয়োগ ঝুঁকি তত বাড়বে।

রিলেটিভ মার্কেট এনালাইসিসএ : পদ্ধতি আপনাকে মার্কেটের সাথে নতুন শেয়ারের মূল্যের একটি তুলনামূলক চিত্র প্রদান করবে। যে কোন দৈনিক পত্রিকা থেকেই আপনি মার্কেটের বর্তমান PE ও খাত ভিত্তিক PE এই দুটি তথ্য পাবেন। অথবা স্টক বাংলাদেশের এনালাইসিস দেখতে পারেন।

উদাহরণ স্বরূপ– মার্কেটের বর্তমান PE ১৭ আর বস্ত্র খাতের PE ১৪। এখন বাজারে আসা নতুন কোম্পানিটি যদি বস্ত্র খাতের হয়, তবে আপনি মার্কেট ও সেক্টর PE এর মধ্যে যা ছোট তার সমান PE হয়- এমন মূল্যে শেয়ারটি কিনতে চাইবেন। অর্থাৎ ১৭ ও ১৪ এর মধ্যে যেহেতু ১৪ ছোট তাই আপনি নতুন আসা শেয়ারটি এমন দামে কিনবেন। যেন কোনভাবেই নতুন শেয়ারের PE ১৪ এর বেশি না হয়।

পরিশেষে আবারো ব্যাঞ্জামিন গ্রাহামের একটি উক্তি – “If you are shopping for common stocks, chose them the way you would buy groceries, not the way you would buy perfume.” সাধারন একটি শেয়ার কেনার ক্ষেত্রে, শখের পারফিউম কেনার মত নয় বরং কাঁচা বাজারে সবজি কেনার মত করে দর-দাম করুন। শেয়ার কেনার সময় জিততে না পারলে বিক্রি করেও জেতা সম্ভব নয়। শেয়ারের অন্তর্নিহীত মূল্য বুঝে দাম হাকুন, আপনার বিনিয়োগকে নিরাপদ রাখুন।

লেখক : মোহাম্মদ হাসান শাহারিয়ার

(লেখাটি সংক্ষেপিত ও সংগৃহিত)

10 COMMENTS

  1. My sincere thanks and appreciation to Mr. Hassan Shahariar for this wonderful article, which will benefit not hundreds, a thousands of small investors.

    I take the opportunity to thanks the management of Bangladesh Stock as well for finding/hiring an extra ordinary “expert” like Mr. Hassan Shahariar. Whenever, he writes an article, he gives deep routed information, and it is clear, he wants to help people, such a person rare in Bangladesh.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here