একজন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী হিসেবে শেয়ার মার্কেটে আছি ২০০৭ -এর শুরুতে। কোন প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই অনেকটা ঝোঁকের বশে ঢুকে পড়ি। বন্ধুর পরামর্শে মাত্র ত্রিশ হাজার টাকায় একটি ব্যাংকের শেয়ার কিনে আমার শুরু। প্রথম ২-৩ দিন দাম বাড়লেও এর পর থেকেই মূল্য পতন শুরু হয়।

দাম যত পড়ে আমার হতাশা ততো বাড়ে। অথচ বাজারে থাকা অন্য ব্যাংকগুলোর শেয়ার দর তখন বাড়ছিল। পতনের কারণ খুঁজতে গিয়ে জানলাম ব্যবসার অ-আ, ক-খ কিছুই আমি জানিনা। কোন কিছু না জেনে, না বুঝে ধার করা বিদ্যায় ব্যবসা করলে লোকসান অবসম্ভাবি। এটা আমার সৌভাগ্য যে, শেয়ারবাজারে লাভের আগেই ক্ষতির সম্মুখীন হওয়ায় আমার টনক নড়ে।

টাকা হারানোর শোক ভুলে তাই শেয়ারবাজার নিয়ে পড়া-লেখা শুরু করি। নতুন আইডিয়া নিয়ে চিন্তা-ভাবনার করার পাশাপাশি টুকটাক লেখালেখি ও শুরু করি।

নেট ঘেটে বিভিন্ন ব্লগ, ওয়েবসাইট, ম্যাগাজিন, পত্রিকা পড়েই ধীরে ধীরে শিখেছি নিয়ম-কানুন। খুবই কষ্টকর পদ্ধতি, কোথা থেকে শুরু করব- এটা বুঝতেই ৬ মাস লেগেছিল আর রিসোর্সের সল্পতা ছিলই। আমাদের শেয়ার বাজারের মূল সমস্যা হল প্রচুর অজ্ঞ বিনিয়োগকারীর উপস্থিতি। এখানকার ৮০ ভাল লোক শিক্ষিত হলেও তাদের কতোজন শেয়ার ও শেয়ার মার্কেট সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। নিয়ম-নীতির ধার না ধেরে আমাদের মার্কেট উঠা-নামা করে গুজব আর হুজুগের উপর।

তাই ভাবলাম আমি একা স্বশিক্ষিত না হয়ে আমার সীমিত জ্ঞান সবার সাথেই শেয়ার করি। আর এতে যদি কারো নূন্যতম কোন উপকার হয় তবে ক্ষতি কি? এত কেজি ওয়ান-টু র কোন পাঠ না যে শেয়ার করলেই ক্লাসের অন্য কেউ ফার্স্ট হয়ে যাবে। তাহলে শুরু করা যাক –

আসুন শেয়ার বাজারের প্রচলিত কিছু টার্মস শিখি-

  • Earning Per Share (EPS): শেয়ার প্রতি আয়- ধরুণ কোম্পানি ‘ক’ -এর মোট বাৎসরিক আয় ১০০ টাকা এবং মোট শেয়ারের সংখ্যা ১০ টি । সুতরাং শেয়ার প্রতি আয় হল ১০০/১০ =১০ টাকা । এটি যতো বেশি হবে সেই শেয়ার ততো বেশি ভাল হলে বিবেচিত হবে।
  • Net Asset Value (NAV): শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ –একটি কোম্পানি দুই ধরণের উৎস থেকে তার ব্যবসায়িক মূলধন যোগাড় করে – (১) শেয়ারধারীদের মূলধন ও (২) ধার/ব্যাংক ঋণ। এই মূলধনে অর্জিত সম্পদ থেকে সব ধরনের লোন বাদ দিলে পাওয়ায় যায় নিট সম্পদ। ধরুণ কোম্পানি ‘ক’ এর নিট সম্পদ ১০০০ টাকা এবং মোট শেয়ারের সংখ্যা ১০ টি । সুতরাং শেয়ার প্রতি নিট সম্পদ হল ১০০০/১০=১০০ টাকা । এটা যতো বেশি হবে সেই শেয়ার ততো ভাল এবং এর দাম ও বেশি হবে।
  • Price Earning Ratio (P/E): কোম্পানির বাজার মূল ও আয়ের অনুপাত। ধরুণ কোম্পানি ‘ক’ -এর শেয়ারপ্রতি আয় ১০ টাকা এবং মার্কেটে চলতি মূল্য ১৪০ টাকা। সুতরাং দাম ও আয়ের অনুপাত হল ১৪০/১০ =১৪ । এটা যতো বেশি হবে সেই শেয়ার বিনিয়োগের জন্য ততো বেশি ঝুকিপূর্ণ। সাধারণত এই অনুপাত ২০ এর বেশি হলেই সেই শেয়ারকে ঝুকিপূর্ণ ভাবা হয়। শেয়ার কেনার সময় এই অনুপাত যতো কম হয় ততোই ভাল।
  • Face value: – শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য -এর উপর ভিত্তি করে কোম্পানি ক্যাশ বোনাস ঘোষণা করে। আমাদের বাজারের প্রয় সব শেয়ারের ফেস ভ্যালু এখন ১০ টাকা।
  • Market value: – চলতি বাজার মূল্য।
  • The authorized capital: – কোন কম্পানির সর্বোচ্চ মূলধনের পরিমান (আপার লিমিট)।
  • Paid-Up Capital: শেয়ারের প্রাথমিক মূল্য/ফেস ভ্যালু অনুযায়ি সকল শেয়ারের মোট মূল্য।

ব্যবসা বাণিজ্য সম্পর্কিত পত্রিকা, ডিএসইর নিউজ পড়ুন। শেয়ারবাজারে থাকা কোম্পানিগুলো খোঁজ-খবর এখানে পাবেন। আর যারা সেকেন্ডারি মার্কেটে যাবেন তারা বিনিয়োগ করার পুর্বেই বাজার পর্যবেক্ষণ করুন এবং বাজার সম্পর্কিত জ্ঞান কতটা হল, তা যাচাই করুন। বাজারে লেনদেন শুরুর আগে ভার্চুয়াল ট্রেডিং করুন।মানে প্রথমে কাগজে-কলমে কল্পিত টকায় শেয়ার কিনে ২-৩ মাস ব্যবসা করুন। 

প্রথমেই মনে মনে ধরুণ- আপনার কাছে ১ লাখ টাকা আছে। এবার আপনার পছন্দের শেয়ার কিনুন (ভার্চুয়ালি)। লাভ হলে বেচুন আর লস হলে বাঁচার উপায় খুঁজুন। এইভাবে ৩-৪ মাস ভার্চুয়াল ট্রেডিং করলেই আপনি বুঝতে পারবেন আসল মার্কেটে আপনার অবস্থান কেমন হবে। বাজারে আপনিও মুনাফা করতে সক্ষম এই কনফিডেন্স অর্জিত হলেই নগদ টাকায় ধীরে ধীরে বিনিয়োগ শুরু করুন। 

  • লেখক : মোহাম্মদ হাসান শাহরিয়ার, আমেরিকা থেকে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here