কমছে সঞ্চয়পত্রের সুদহার

0
1719
ছবি : সংগৃহিত

স্টাফ রিপার্টার : সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা। আর এজন্য তারা একাধিক সুবিধাও নিয়েছেন সরকারের কাছ থেকে। এরপরও কমছে না সুদের হার। বরং আরো বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে তারা বলছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অলস পড়ে থাকা টাকা বেসরকারি ব্যাংককে ব্যবহার করতে দিলে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ ছাড়া সঞ্চয়পত্রের সুদহার সমন্বয় হলে, ব্যাংক আমানতে সুদ হার কমে আসবে বলে দাবি তুলেছেন। ইতিমধ্যে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের কথা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে চার ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংক মালিকরা। বিএবির চাহিদা অনুযায়ী সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখা; সিআরআর ১ শতাংশ হ্রাস; ঋণ আমানতের হার (এডিআর) সমন্বয়সীমার সময় বাড়ানো এবং রেপো রেট ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ করা হয়েছে। তারপরও ঋণের সুদহার বাড়ছে এবং তা আরো বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি, বেসরকারি বা বিদেশি সব খাতের ব্যাংকই ঋণের সুদ বাড়িয়ে দিয়েছে। মার্চ মাসে ৪৪টি ব্যাংক ঋণের সুদ বাড়িয়েছে। দেশের ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের মধ্যে সবগুলোতেই এখন দুই অঙ্কের সুদ গুনছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমানে শিল্পঋণ পেতে ব্যবসায়ীদের ২২ শতাংশ পর্যন্ত সুদ গুনতে হচ্ছে।

বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) নেতাদের মতে, সঞ্চয়পত্রের সুদ কমলে ব্যাংকিং খাতে তারল্য বাড়াতে সহায়ক হবে। এর ফলে ব্যাংক ঋণে সুদ হার এক অঙ্কে নেমে আসবে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো মোটেও ঠিক হবে না। কারণ এখানে যারা টাকা রাখছে তারা সুদহার কমালেও ব্যাংকে যাবে না। ব্যাংকের সুদহার কমানোর জন্য (ব্যাংকের ঋণ ও আমানতের মধ্যকার সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) তিন শতাংশে নিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরো বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের এমডিদের বেতন অনেক কমানো উচিত। ব্যাংকের এ ধরনের খরচ কমালেই সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা সম্ভব হবে। তার মতের সঙ্গে প্রায় একই মত প্রকাশ করলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ। তিনি এ বিষয়ে বলেন, বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা এক ধরনের চক্রান্তে নেমেছে। তারা চেয়েছিল, এই সুযোগে সরকারের কাছ থেকে কিছু টাকা বের করে নেবে। এ বিষয়ে সফলও হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে আরো ক্ষতি না করার পরামর্শ দেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে বিএবি সভাপতি ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, ব্যাংক ঋণে সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে সরকারের পাশাপাশি আমরা সবাই চেষ্টা করছি। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে আমরা ব্যাংক খাতে সুদহার কমাতে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছি। দেশে বিনিয়োগের স্বার্থে সরকারি ব্যাংকে পড়ে থাকা অলস অর্থ আমরা কাজে লাগাতে চাচ্ছি, পাশাপাশি সঞ্চয়পত্রের সুদহার সমন্বয় হলে, ব্যাংক আমানতে সুদহারও কমে আসবে। এ নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে অচিরেই বৈঠক হবে বলেও জানান তিনি।

এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদের কারণে সার্বিকভাবে আর্থিক খাত ও বন্ড বাজারের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রের সুদহার অর্থবাজারে বিদ্যমান সুদহারের চেয়ে বেশি হওয়ায় সরকারের দায় বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মাহফুজা আকতার স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সঞ্চয়পত্রের সুদহার যৌক্তিকীকরণের বিষয়টি সরকার সুবিবেচনায় নিতে পারে।

সরকারের অর্থবিভাগ থেকেও বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্র বিক্রির ফলে সুদ বাবদ সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হবে, যা স্বল্প ও মধ্য মেয়াদে সরকারের বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এমন পরিস্থিতিতে সঞ্চয় প্রকল্পের সুদের হার রিভিউ করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

এদিকে আগামী বাজেটের পর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও। গত ১২ মে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে প্রাক-বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটের পর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় (কমানো) হবে।

অর্থমন্ত্রী সে সময় বলেন, সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কিছুটা বেশি বলে সব পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে। যদিও গত বছর বাজেটের আগে তিনি সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। গত বছরের ১৫ জুন সংসদে অর্থমন্ত্রীকে একহাত নেন মন্ত্রিসভায় তার সহকর্মী মতিয়া চৌধুরী। তিনি বলেন, এই সুদ বাবদ খরচ ১০ শতাংশ যদি বেশি হয়, তাহলে দাঁড়াবে এক হাজার কোটি টাকা। আর এই টাকার সুবিধা কারা পাচ্ছে? লাখ লাখ লোক। এদের মধ্যে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত, সিনিয়র সিটিজেন, নারী, বিধবা নারী, মুক্তিযোদ্ধা, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি-বেসরকারি কর্মচারীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এদের কোনো নিরাপত্তা প্রকল্প নেই। এরা ট্রাকসেলে দাঁড়াতে পারে না, হাত পাততে পারে না।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র বলছে, বাজেটের পর সঞ্চয়পত্রে সুদের হার দুই শতাংশ পর্যন্ত কমানো হতে পারে। সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নীতিমালাতেও বেশকিছু পরিবর্তন আনা হচ্ছে। অবশ্য দীর্ঘদিন ধরেই সঞ্চয়পত্রে সুদের হার কমাতে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে আসছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এর আগে ২০১৫ সালের মে মাসে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার দুই শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছিল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here