এমারাল্ড অয়েলের উৎপাদন বন্ধ

0
1949

রাহেল আহেমেদ শানু : চলতি বছরের শুরুর দিকেই এমারাল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের মিলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। অর্থ আত্মসাতের দায়ে একাধিক উদ্যোক্তার নামে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ও ব্যাংকের কাছে বড় দেনার কারণে কোনো ব্যাংকের কাছ থেকে চলতি মূলধনও পাচ্ছে না খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, সব সমস্যা কাটিয়ে দ্রুতই উৎপাদন শুরু করতে পারবে তারা। কোম্পানির দায়িত্বশীল অন্য কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষায় কাঁচামাল সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন সাময়িক বন্ধ থাকে।

তবে কারখানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের শুরুর দিকেই এমারাল্ড অয়েলের রাইস ব্র্যান অয়েল মিলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়, যা এখনো চালু হয়নি। টেকনিশিয়ানসহ অনেক কর্মী এরই মধ্যে চলে গেছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, কারখানার সর্বোচ্চ সক্ষমতা ব্যবহার করতে গেলে প্রতিদিন ৩০০ টন কাঁচামাল প্রয়োজন হবে এমারাল্ড অয়েলের, যার বাজারমূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। কারখানা চালু করতে অন্যান্য খরচসহ প্রতিদিন ১ কোটি টাকা ব্যয় হবে তাদের।

তবে কারখানা চালুর পর সব প্রক্রিয়া শেষ করে উৎপাদিত তেল বাজারে বিক্রি করে এর দাম তুলে আনতে কমপক্ষে ১৫ দিন সময় লাগবে। সে হিসেবে ধারাবাহিক উৎপাদনের জন্য চলতি মূলধন প্রয়োজন হবে ১৫ কোটি টাকার বেশি। কোম্পানির হাতে এ পরিমাণ অর্থ নেই।

এদিকে সার্বিক আর্থিক অবস্থা ও ব্যাংকঋণ ইস্যুতে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিরুদ্ধে দুদকের চলমান মামলার কারণে কোনো ব্যাংক তাদের চলতি মূলধন জোগাতে এগিয়ে আসছে না।

এ প্রসঙ্গে, এমারাল্ড অয়েলের মহাব্যবস্থাপক আহসানুল হক তুষার বলেন, উৎপাদন শুরু করতে যে অর্থ প্রয়োজন, এই মুহূর্তে আমাদের হাতে তা নেই। তবে ব্যাংক এশিয়া ও মাইডাস ফিন্যান্সের সঙ্গে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। সেখানে কোম্পানির কিছু ক্রেডিটও রয়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের প্রত্যাশা, চলতি মাসের শেষ দিকেই আমরা উৎপাদন শুরু করতে পারব।

কোম্পানির কারখানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেরপুর সদরে অবস্থিত কারখানাটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে বন্ধ রয়েছে। কারখানার কর্মকর্তাদের মধ্যে ভারতীয় টেকনিশিয়ানরা এরই মধ্যে চাকরি ছেড়ে নিজ দেশে চলে গেছেন।

দেশীয় কয়েকজন কর্মকর্তা এখনো উৎপাদন শুরুর অপেক্ষায় আছেন। তবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে অস্থায়ী কর্মকর্তা ও শ্রমিকদের। আর বিপণন পর্যায়েও হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অবশিষ্ট রয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক বলেন, কারখানা ছয় মাস নয়, দুই-তিন মাস ধরে উৎপাদন বন্ধ। বর্ষা মৌসুমে ধানের কুড়ার সংকট থাকায় এ সময়টায় আমরা উৎপাদন বন্ধ রাখি। ভারতীয় টেকনিশিয়ানরা ছুটিতে আছেন। এরই মধ্যে তাদের ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিরতির কারণে বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ চাকরি ছেড়ে চলে গেছেন। উৎপাদন শুরু হলে সারা দেশে ডিলারদের মাধ্যমে বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বেসিক ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতির দায়ে দুদকের মামলায় গত ২৮ মার্চ কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিবকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে তিনি জামিনে আছেন বলে জানিয়েছেন এমারাল্ড অয়েলের কোম্পানি সচিব মেহেরুন্নেছা রোজি।

দুদকের মামলায় এমারাল্ড গ্রুপের মোট পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ২০৬ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এর মধ্যে এমারাল্ড অয়েলের বিরুদ্ধে মোট ৭৪ কোটি ১৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগ করা হয়।

মামলায় কোম্পানির এমারাল্ড অয়েলে চেয়ারম্যান সৈয়দ মনোয়ারুল ইসলাম, এমডি হাসিবুল গনি গালিব, পরিচালক এএসএম মনিরুল ইসলাম, সজন কুমার বসাক ও অমিতাভ ভৌমিকসহ বেসিক, বেসিক ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়।

এমারাল্ড অয়েল মামলার এজাহার অনুসারে, এমারাল্ড অয়েলের চেয়ারম্যান সৈয়দ মনোয়ারুল ইসলাম ও এমডি সৈয়দ হাসিবুল গনি গালিবসহ এর পরিচালনা পর্ষদ নতুন কোম্পানি চালুর কথা জানিয়ে প্রস্তাবিত ৪০ কোটি ৫০ লাখ টাকার প্রকল্পের বিপরীতে ৭৪ কোটি ১৪ লাখ ৯৯ হাজার টাকার ঋণ নেন। যদিও কোম্পানির চেয়ারম্যান, এমডি ও পরিচালকদের সমন্বিত সম্পত্তি ৩১ কোটি ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। তদন্ত শেষে ২০১৫ সালে রাজধানীর মতিঝিল থানায় মামলা করে দুদক।

চলতি মূলধন সংকট ও উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য দুঃসংবাদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে কোম্পানির ব্যাংকঋণ। বেসিক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও মাইডাস ফিন্যান্সিং লিমিটেডের কাছে কোম্পানির বর্তমান দায় ১১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৭৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ও এ ঋণের চলতি দায় রয়েছে ১৪ কোটি টাকা। এর বাইরে স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে অন্তত ২৭ কোটি টাকার।

২০১৪ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় এমারাল্ড অয়েল। ১০০ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের বিপরীতে এর পরিশোধিত মূলধন ৫৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা। মোট শেয়ারের মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের হাতে ৩০ দশমিক ৪৫ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১০ দশমিক ৪৮ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে ৫৯ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ শেয়ার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here