এপেক্স ট্যানারির সক্ষমতা বাড়ছে

0
537

সিনিয়র রিপোর্টার : এপেক্স ট্যানারি লিমিটেড সাভারের হরিণধরায় বাংলাদেশ চামড়া শিল্পনগরীতে স্থাপিত নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরু করেছে। চামড়া প্রস্তুতের প্রাথমিক ধাপ ওয়েট ব্লুর কাজ চলছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্ব হিসেবে পরিচিত ক্র্যাশ ও ফিনিশিংয়ের জন্য নতুন কারখানায় যন্ত্রপাতি স্থাপনের কাজ চলছে।

প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কারখানা পুরোদমে চালু হলে এপেক্স ট্যানারির উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ শতাংশের বেশি বাড়বে।

কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, চামড়া শিল্পনগরীতে নতুন কারখানা স্থাপিত হওয়ায় পরিবেশ সুরক্ষাসহ অন্যান্য ইস্যুতে এপেক্স ট্যানারি শতভাগ কমপ্লায়েন্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। কর্মীদের জন্য ভালো কর্মপরিবেশসহ অন্যান্য অগ্রগতির কারণে কোম্পানি বিদেশী ক্রেতাদের কাছেও সমীহ পাবে বলে আশা করছেন তারা।

কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ১ লাখ ১৮ হাজার বর্গফুট জায়গায় চলতি বছরের শুরুতে ভবন নির্মাণ শুরু করে এপেক্স ট্যানারি। প্রাথমিকভাবে ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি, পরবর্তীতে যা আরো বেড়েছে। এর বাইরে সরকারের কাছে প্রণোদনা হিসেবে পেয়েছে ১০ কোটি ৫ লাখ টাকা।

চারতলাবিশিষ্ট মূল ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলে চলতি বছরের ২৫ আগস্ট দ্বিতীয় তলায় আনুষ্ঠানিকভাবে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে ৩২টি ড্রাম বসিয়ে ওয়েট ব্লু ইউনিটে কাজ শুরু করে এপেক্স ট্যানারি। বর্তমানে তা ৪০টিতে উন্নীত হয়েছে। এসব ড্রামে দৈনিক ২ হাজার ৫০০টি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে পারছে কোম্পানিটি।

এ প্রসঙ্গে এপেক্স ট্যানারির নির্বাহী পরিচালক (কারখানা) এমএ মাজেদ বলেন, সরকারের চাপে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরু করতে হয়েছে আমাদের। গত সেপ্টেম্বর থেকে সাভারে স্বল্প পরিসরে ওয়েট ব্লুর কাজ শুরু করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত কারখানায় নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হচ্ছে। হাজারীবাগের কারখানায় দৈনিক দেড় থেকে দুই হাজার চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে পারলেও নতুন কারখানায় তা তিন হাজারে উন্নীত হবে। এরই মধ্যে নতুন কারখানায় দৈনিক আড়াই হাজার চামড়ার ওয়েট ব্লু শুরু হয়েছে।

তিনি আরো জানান, সাভারের কারখানার সব অবকাঠামো শেষ হয়নি। চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ওয়েট ব্লু সম্পন্ন করে ক্র্যাশ ও ফিনিশিংয়ের জন্য তা হাজারীবাগেই নিতে হচ্ছে। সব অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করে চলতি বছরের শেষ দিকে কারখানা, অফিস— সবই নতুন প্লটে নিয়ে আসা হবে। তখন উৎপাদন সক্ষমতা ৩০-৩৫ শতাংশ বাড়বে। তবে উৎপাদন নির্ভর করবে রফতানি আদেশের ওপর।

তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানির কারখানা স্থানান্তর, নতুন ইউনিটের বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু কিংবা কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত তথ্য স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে সিকিউরিটিজ আইনে। তবে এপেক্স ট্যানারির নতুন কারখানায় উৎপাদন শুরু ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। এ প্রসঙ্গে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএম মাজেদুর রহমান বলেন, কোম্পানির কাছ থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো তথ্য আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি।

সাভারের কারখানা ঘুরে দেখা গেছে, চারতলাবিশিষ্ট ভবনের দ্বিতীয় তলায় কাঁচা চামড়া প্রস্তুতের কাজে ব্যস্ত ১৫০-২০০ জন শ্রমিক। তৃতীয় তলায় ক্র্যাশ ও ফিনিশিং ইউনিটের যন্ত্রাংশ স্থাপনের কাজ চলছে। আগের কারখানার পুরনো যন্ত্রপাতি না বসিয়ে চীন, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে থেকে আমদানি করা নতুন যন্ত্রপাতি বসানো হচ্ছে। চতুর্থ তলায় কোম্পানির মূল কার্যালয় স্থাপনের জন্য দেয়ালে রঙ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করছেন শ্রমিকরা। পাশেই কর্মকর্তাদের কোয়ার্টার, মিনি হাসপাতাল ও জেনারেটর ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।

অন্যদিকে আদালতের নির্দেশে এপেক্স ট্যানারির হাজারীবাগ কারখানার ওয়েট ব্লু ইউনিটের কাজ বন্ধ করে দেয়া হলেও ঈদ-পরবর্তী ব্যস্ততায় সেখানে স্বল্প পরিসরে অন্য ইউনিটগুলোর কাজ চলছে। সাভারের কারখানা চালু করায় কোনো জরিমানা গুনতে হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

এদিকে নতুন কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও চামড়ার চাহিদা কমে যাওয়ায় তা কাজে লাগানো নিয়ে কিছুটা শঙ্কায় রয়েছে কোম্পানিটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সর্বশেষ হিসাব বছরে কাঁচা চামড়া কিনে প্রস্তুতের পর তার উল্লেখযোগ্য অংশ মজুদ রাখতে হয়েছে।

সর্বশেষ হিসাব বছরে ২০১৪-১৫ হিসাব বছরের তুলনায় এপেক্স ট্যানারির উৎপাদন প্রায় ৪৩ শতাংশ কমেছে। তবে দেশে কাঁচা চামড়ার দাম ও কোম্পানির পরিচালন ব্যয় কমায় এপেক্স ট্যানারির মুনাফায় এর প্রভাব তেমন পড়েনি। ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে এ কোম্পানির মোট বিক্রি হয়েছে ২১৫ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার টাকা, যা আগের বছর ছিল ৩৭৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা।

নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানি উল্লেখ করেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থনৈতিক মন্দা ও চীনে প্রচুর চামড়া মজুদ থাকায় বাংলাদেশী চামড়ার বিক্রি কমে গেছে। তবে ভবিষ্যতে চামড়া রফতানি বাড়ানোর চেষ্টা করে যাবে এপেক্স ট্যানারি।

নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুসারে, সর্বশেষ হিসাব বছরে এপেক্স ট্যানারির নিট মুনাফা হয়েছে ৯ কোটি ৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা, যা আগের বছর ছিল ৯ কোটি ৫২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শেয়ারহোল্ডারদের ৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি। সমাপ্ত হিসাব বছরে এর শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৫ টাকা ৯৭ পয়সা, আগের বছর যা ছিল ৬ টাকা ২৫ পয়সা।

লভ্যাংশ ও অন্যান্য এজেন্ডা অনুমোদনে আজ রোববার সকাল ১০টায় রাজধানীর গুলশানে অবস্থিত শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করবে কোম্পানিটি। ২০১৪-১৫ হিসাব বছরে শেয়ারহোল্ডারদের ৪৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিল এপেক্স ট্যানারি।

১৯৮৫ সালে তালিকাভুক্ত এপেক্স ট্যানারির অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি ও পরিশোধিত মূলধন ১৫ কোটি ২০ লাখ টাকা। রিজার্ভের পরিমাণ ৫৪ কোটি ২০ লাখ টাকা। এ কোম্পানির মোট শেয়ার সংখ্যা ১ কোটি ৫২ লাখ ৪০ হাজার। এর মধ্যে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে ৫২ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে ১০ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে বাকি ৩৮ শতাংশ শেয়ার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here