উৎপাদন বন্ধ, লভ্যাংশের চেক ফেরত : তবুও দর বাড়ছে রহিমা ফুডের

1
703

বিশেষ প্রতিনিধি : খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের রহিমা ফুড কোম্পানির উৎপাদন বন্ধ। তবুও শেয়ার দর অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। দর বৃদ্ধির পেছনে কোন মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই বলেও কোম্পানিটি জানিয়েছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জকে।

গত পাঁচ কার্যদিবসে এ কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে ৩৭ শতাংশ বা ১৩ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ কোম্পানিটির শেয়ার দর এ সময়ে ৩৬ টাকা থেকে বেড়ে দাড়িয়েছে ৪৯ টাকা ৫০ পয়সা। মঙ্গলবার ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এর আগে ২০১৩ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য ঘোষিত ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিতে পারছে না রহিমা ফুড। কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) অনুমোদন পায় এই পরিমাণ লভ্যাংশ দেয়ার। তবে ঘোষণার পর ব্যাংকে নগদ টাকা না থাকায় বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য লভ্যাংশের চেক ফেরত আসছে।

বাজার পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে এই শেয়ারের দর অস্বাভাবিকহারে বাড়তে থাকে। এর কারণ জানতে সিএসইর পক্ষ থেকে কোম্পানির কাছে চিঠি দেয়া হয়। ডিএসইর চিঠির জবাবে কোম্পানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে এ কোম্পানির শেয়ার দর অস্বাভাবিকহারে বৃদ্ধির পেছনে কোন মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।

এদিকে কোম্পানির উত্পাদন বন্ধ ও বড় অঙ্কের পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকায় এ লভ্যাংশ শেয়ারহোল্ডারদের দিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি এ কোম্পানির একাধিক সাধারণ শেয়ারহোল্ডার ডিভিডেন্ড ওয়ারেন্ট ব্যাংকে উত্থাপন করলে তা ফেরত দেয় ব্যাংক। আর এর কারণ হিসেবে ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ নেই বলে জানানো হয়। যেসব চেকের একাধিক অনুলিপি অভিযোগ আকারে আসে।
এমনই একটি অভিযোগ আসে মার্কেন্টাইল ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে। যেখানে ডিভিডেন্ড ওয়ারেন্টের একটি চেক চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি উত্থাপন করা হয়। তবে ব্যাংক হিসাবে অর্থ না থাকায় ফেরত আসে। ১২ ফেব্রুয়ারিতে চেকটি পুনরায় উত্থাপন করা হলে একই কারণে ফেরত আসে। আর উত্থাপিত চেকের অর্থ না পাওয়ায় এজন্য মার্কেন্টাইল সিকিউরিটিজকে দুবার জরিমানা গুনতে হয়েছে। এ বিষয়ে বক্তব্য নেয়ার জন্য কোম্পানিতে একাধিকবার ফোন করা হলেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ ২০১৩ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত হিসাব বছরের জন্য শুধু সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে; যা ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর এজিএমে অনুমোদিত হয়। সংশ্লিষ্ট হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয় ৫২ পয়সা ও শেয়ারপ্রতি নেট সম্পদমূল্য (এনএভি) ৪ টাকা ৪৫ পয়সা। কোম্পানিটির দেয় লভ্যাংশের মোট টাকার পরিমাণ ছিল ৯৪ লাখ ২ হাজার ৯৩০ টাকা।
গত বছরের অক্টোবরে ডিএসইর প্রতিনিধি দল কোম্পানির কারখানা পরিদর্শন করে। কোম্পানিটির উত্পাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে বলে জানায় তারা। এছাড়া একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর বিক্রিনির্ভরতা, মানসম্মত উত্পাদন ক্ষমতা ব্যবহারে ব্যর্থতা, বিক্রয়কৃত পণ্যের খরচ বেশি হওয়া এবং শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ নেতিবাচক থাকায় কোম্পানিটি অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে বলে জানিয়েছে নিরীক্ষক।
২০১৩ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, কোম্পানিটি তার মোট বিক্রয়ের ৯৫ শতাংশ বিলম্বে মূল্য পরিশোধ হওয়ার ভিত্তিতে মেসার্স মোহাম্মদ ইলিয়াস ব্রাদার্স লিমিটেডের কাছে পণ্য বিক্রি করেছে। এতে ওই প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৭ কোটি ৭৪ লাখ ৫৯ হাজার ৯২৬ টাকা। তবে এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের মতামত হচ্ছে, সম্ভাব্য ক্ষতি এড়িয়ে বাজার দরের চেয়ে বেশি দাম পাওয়ার জন্য বিলম্বে পরিশোধ করার শর্তে পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। লেনদেনটি চুক্তিপত্র এবং ৮৯ কোটি টাকার তারিখবিহীন নিশ্চয়তাযুক্ত চেকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে বিক্রয়ের জন্য শুধু একটি কোম্পানির ওপর নির্ভরতা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এবং অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মত দিয়েছেন নিরীক্ষক।
উত্পাদন ক্ষমতা ব্যবহার করার দিক থেকে কোম্পানি মানসম্মত অবস্থার তুলনায় শোচনীয় পর্যায়ে রয়েছে। কোম্পানিটির মোট ব্যবহার ক্ষমতা কাজে লাগানোর হার ১৯ দশমিক ২৪ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ১৩ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। তবে কোম্পানিটির আর্থিক ভিত্তিকে মজবুত করার জন্য উত্পাদন ক্ষমতা সর্বোচ্চ মাত্রায় ব্যবহার করতে নিরীক্ষক মত দিয়েছেন।
এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৩০ জুন তারিখে পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ২১ লাখ ৩২ হাজার ৭৭৭ টাকা এবং স্বল্পমেয়াদে ব্যাংকঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৪ কোটি ২৮ লাখ ৮৩ হাজার ২৬১ টাকা। এসব বিষয়ে দায় পরিশোধ করার ক্ষেত্রে কোম্পানিটির অর্থবহ অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়া বিক্রয়কৃত পণ্যের খরচ মোট টার্নওভারের ৯৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, যা খুব বেশি এবং গত বছর এর পরিমাণ ছিল ৯৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ। এদিকে বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী কোম্পানির মুনাফা কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হয়নি এবং তহবিলটি আইন অনুযায়ী গঠন করা হয়নি। দেনাদারের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ১ জুলাই থেকে ২০১৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর ১৪ কোটি ৮৪ লাখ ৯৭ হাজার ৪৮৬ টাকার পরিমাণ সুদ আর্থিক খরচের পরিবর্তে দেনাদারের বিপরীতে চার্জ করা হয়েছে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, কোম্পানিটির পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ প্রবাহের অধীনে সরবরাহকারী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্যদের পরিশোধ, ক্যাশ ক্রেডিট ও পিএডির বিপরীতে আমদানি ঋণের সুদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। একই সময়ে শেয়ারপ্রতি নেতিবাচক প্রকৃত পরিচালন নগদ প্রবাহে লোকসান হয়েছে ১ টাকা ২৯ পয়সা। এ বিষয়ও কোম্পানির অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মনে করছেন নিরীক্ষক।

1 COMMENT

  1. একটি কোম্পানী লোকসানে থেকে ও কি ভাবে ডিভিডেন্ড ঘোষনা করে, আমাদের নিয়ন্ত্রণ সংস্তার কি কিছুর চোখে পড়ে না. আমরা সাধারণ বিনিয়োগ কারিরা এ থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাব…

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here