ইউনাইটেড এয়ার এবং বিনিয়োগকারীর স্বার্থ

14
36080

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (বিডি) লিমিটেডে রয়েছে ১ লাখ ২২ হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী। হাজার কোটি টাকার মুলধন নিয়ে কোম্পানির ১২ বিমানের উড্ডয়ন বন্ধ রয়েছে। যে কারণে কোম্পানির শেয়ারের মূল্য দিনে দিনে তলানীতে ঠেকেছে।

কোম্পানির ১ লাখ ২২ হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থে টান পড়েছে। এসব সাধারণ বিনিয়োগকারীর স্বার্থ রক্ষার্থে কেউ এগিয়ে আসছে না। আমি মোহাম্মাদ মনিরুল ইসলাম, সাধারণ একজন বিনিয়োগকারী। আমার পোর্টফোলিওর দিকে আমি আর থাকতে পারছি না। আমার বিনিয়োগ করা মূলধনের বিপুল পরিমাণ উধাও হয়েছে। বুকের ভেতরে তীব্র যন্ত্রণা।

আমি জানি, আমার মতো আরো অনেকে পথে বসেছেন। প্রতিদিন আরো কমছে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি দর। কারো কতো দর কমলে কোম্পানির প্রতি দৃষ্টি পড়বে সরকার ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের।

সরকার ও কর্তৃপক্ষ কেন দৃষ্টি দেবেন- তার ব্যাখ্যা হিসেবে বলছি। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বেসরকারি বিমান সংস্থা ও সর্ববৃহৎ বিমান পরিবহন কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমানে ৯৫.৮৪ শতাংশ শেয়ারের মালিক সাধারণ বিনিয়োগকারী। কোম্পানির বাকি ৪.১৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী ও পরিচালক শাহাবুদ্দিনসহ আরো অনেক উদ্যোক্তার হাতে।

সাবার উদ্দেশ্যে এবার আমি ছোট করে একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। এরপরে অন্যকথা। তা হলো- প্রতিষ্ঠানটি ২০১০ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। পর্যায়ক্রমে- ৫ শতাংশ, ১০ শতাংশ, ১৫ শতাংশ, ১২ শতাংশ, ১০ শতাংশ ও ১০ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের বোনাস দিয়েছে। অন্যান্য কোম্পানিগুলোর মতো বেশ ভালো করেছে।

৬ বছরের পরিসেবায় ইউনাইটেড এয়ার দেশে-বিদেশে প্রায় ৫২ হাজার ফ্লাইট পরিচালনা করে। প্রায় ১৪ লাখ যাত্রী এবং ২ হাজার ৮০০ টন মালামাল পরিবহন করেছে। সব মিলিয়ে কোম্পানির কর্মী সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ১০০ জন ছিল। বিমান সংস্থাটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক মিলে প্রায় ১৪ টি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করে।

এখন প্রশ্ন হল, ২০১৬ সালের মার্চ মাস থেকে আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিষ্ঠানটি কেন বন্ধ হয়ে গেল? ভেতরের মূল ঘটনা কেউ আজো প্রকাশ করেনি। আমি মনে করি, তা খতিয়ে দেখা দরকার।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক সঙ্কট তীব্র, বিমানের জ্বালানীর মূল্য বৃদ্ধি প্রধান কারণ। এরপরে বেবিচকের বিভিন্ন কারণে কোম্পানির দূরত্ব বাড়তে থাকে এবং এ নিয়ে পরিচালকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ সময় আরো বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় কমিশনের নীতিমালা। ২০১২ সালে ২% নীতিমালা প্রকট হলে কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে পরিচালকরা তাদের সব শেয়ার বিক্রি করেন। এ সময় অনেক লাভবান হন কিছু পরিচালক।

ক্ষতির মুখে পড়েন সাধারণ বিনিয়োগকারী। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ায় বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী বিশাল ক্ষতির মুখে পড়েছে। বর্তমানে শেয়ারপ্রতি দর ৪ টাকা ৫০ পয়সা। দেশ-বিদেশে থাকা হাজার কর্মচারী হন বেকার। আরো বড় কথা হলো- বাংলাদেশ প্রতি বছরে প্রায় হাজার কোটি টাকা রাজস্ব পেত, এখন তা বন্ধ।

প্রশ্ন হলো- একই সঙ্গে আরো ক্ষতিগ্রস্থ হলো কে? বিশাল সম্ভাবনাময় দেশীয় প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হওয়ায় বিদেশি অনেক কোম্পানি সেই মুনাফা লুটছে। তাহলে বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটছে?

আরো পরিস্কার করা দরকার, কমিশনের ২% নীতি কোম্পানিটি ধ্বংসের নেপথ্যে। কমিশন যদি বৃহৎ, মাঝারি এবং ছোট কোম্পানি পৃথক করে আলাদা নীতিমালা ঘোষণা করতো, তাহলে ইউনাইটেড এয়ার এখনো উড়তো। অথবা কোম্পানির উদ্যাক্তারা তাদের কোন শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন না। শর্ত পালনের পরে বা কমিশনের অনুমতি সাপেক্ষে তারা শেয়ার বিক্রি করতে পারবেন। এতে করে নতুন কোন সমস্যার আলোকে তা সমাধান করা যেত।

শেয়ার বিক্রি করে উদ্যোক্তারা বেরিয়ে যেতে না পারলে বাংলাদেশের সেরা বিমান কোম্পানি হতো ইউনাইটেড এয়ার। আর বাংলাদেশ বিমান হতো দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় বৃহৎ কোম্পানি।

২০১২ সালে কমিশনের শর্তপূরণ করতে না পারায় অনেক কোম্পানির উদ্যোক্তা শেয়ার বিক্রি করেন। এ সময় উদ্যোক্তা এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার ক্রয়-বিক্রির হিড়িক পড়ে। একই সঙ্গে আরো কিছু উপসর্গ যোগ হলে পুঁজিবাজারে বিশাল ধস নামে। এ সময় কমিশনের ২% নীতির প্রতিফলনে অনেক ডিরেক্টর হন কোটিপতি। অন্যদিকে কোটি-কোটি বিনিয়োগকারী হয়েছেন নিঃস্ব। কেউ তাদের আর খবর রাখেনি। তবে আইপিও কোটাতে কিছু বরাদ্দ রেখে তাদের স্মরণ করা হয়।

আরো বলা দরকার, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী প্রাণপণ চেষ্টা চালাতে থাকেন। অনেক চেষ্টায় ২০১২ সালের ২১ ডিসেম্বর শেয়ারের বিনিময়ে ৬টি বিমান দেশে আনার অনুমোদন পান তিনি। ২০১৬ সালে বিএসইসি ৩১২ কোটি ৮০ লাখ ৮৮ হাজার টাকায় ১০ টাকা দরে ৩১ কোটি ২৮ লাখ ৮ হাজার ৮০০টি শেয়ারের বিনিময়ে ৬টি বিমান ক্রয়ের অনুমতি দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

সে পরিপ্রেক্ষিতে চেয়ারম্যান বিমানগুলো দেশে আনতে এবং উড্ডয়নের সব প্রস্তুতি গ্রহণ করেন চেয়ারম্যান। এরপরে বেবিচক কর্তৃপক্ষের কাছে ‘বিমান পরিদর্শন করে আনার অনুমোদন’ পেতে তিনি আবেদন করেন চেয়ারম্যান। কিন্তু আজো তার অনুমোদন মেলেনি।

এখন প্রশ্ন- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কার্যক্রম এতোদূর এগিয়ে যাওয়ার পরও কেন থেমে আছে? বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়, অফিস ও বিমান পরিচালনার জন্য বন্ডের মাধ্যমে আইসিবি ২২৪ কোটি টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করছে। মোট ৬২৪ কোটি টাকার অনুমোদন পেলেও কোন কাজে আসেনি। কেউ সহায়তা করেনি।

এরপরে তাসবিরুল আহমেদ চৌধুরী নিজ চেষ্টায় জনতা ব্যাংকে ঋণের আবেদন করেন। সেটির ফলাফল এখনো প্রক্রিয়াধীন।

দুটি প্রক্রিয়ার আসছে টাকা, তবে আজো আসেনি। আসেনি টাকা, তাই ওড়েনি বিমান। নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং সরকার এগিয়ে এলে ইউনাইটেড এয়ার নিশ্চিত আবারো আকাশে উড়তো। রাজস্ব পেত দেশ, কর্মসংস্থান হতো আরো হাজার কর্মীর। তবে এখনো সুযোগ রয়েছে- শুভ দৃষ্টি দিন।

মোট কথা, বাংলাদেশ সিকিউরিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের ২% নীতির কারণে ইউনাইটেড এয়ারসহ অনেক কোম্পানিতে ধস নামে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনেক পলিসি ভালো হলেও এটাতে ক্ষতির পরিমাণ বেশি। তাই কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি- ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (বিডি) লিমিটেডের প্রতি সদয় হোন এবং শুভ দৃষ্টি দিন। এতে নতুন কর্মসংস্থান হবে এবং দেশের রাজস্ব আসবে। নতুন বিনিয়োগকারীর আগ্রহ বাড়বে। বাঁচবে আমার প্রিয় বাংলাদেশ।

  • (লেখকের নিজস্ব মতামত, সম্পাদক দায়ী নয়)

14 COMMENTS

  1. আমি আমার এই বিনিয়োগ কারি ভাই এর সাথে একমত হয়ে বলতে চাই, আমাদের মাননীয় মন্ত্রী, ডিএসই এর সভাপতি, ডিএসই এর চেয়ারম্যান এবং ইউনাইটেড এয়ারের এমডিআপনাদের সবার কাছে আমার অনুরোধ, আপনারা সবাই মিলে এই দেশের এই
    বেসরকারী বিমান সংস্থাকে বাঁচাতে এবংসাধারন বিনিয়োগ কারিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন,

  2. I think Mr. Chairman is busy with tac airlines, elsewhere united airways could be the number 1 private airline company in Bangladesh.

    Mr. Chairman said United Airways will be number one in South Asia by increasing 100 fleet within 2027 . Newly Indian private company INDIGO started operations in Bangladesh having 161 fleet .

    Better DSE should call a meeting with the help of government and major share holders focusing the future of the company and made a executive panel board hiring expat truly professionals from abroad for operation. Means while DSE should offer an independent investigation to Dudok if any mismatch occurred, otherwise it could be an example for others like opportunities perpetrators !!

    • সরষের ভিতরেই ভূত।আমরা সাধারন বিনিয়োগকারী।এই কোম্পানীতে বিনিয়োগ করে নিঃস্ব।এই কোম্পানী মুখ রোচক ত্তথ্য ও সংবাদ প্রকাশে পটু।বিগত বছর গুলোতে এমনকি চলতি বছ্রেরর জানুয়ারী মাস পর্যন্ত ভাল নিউজ প্রকাশ করেছিল।এখন এই কোম্পানীর কোন খবর নেই।নিয়ন্ত্রক সংস্থার করার কিছুই নেই।সাধারন বিনিয়োগকারী হিসেবে কি করার আছে।২৮ জুন/২০১৮ প্রতিটি শেয়াররে মুল্য মাত্র ৩.৮০টাকা।এর ভবিষ্যত কি?মনে হচ্ছে এই কোম্পানী স্বচ্ছতা,জবাবদিহিতার উর্ধে।এই কোম্পানীর বাস্তবায়নযোগ্য স্বপ্ন(vision),অস্তিত্বের কারন(mission),উদ্দেশ্য(objectives)লক্ষ্য(goal)এবং কৌশল(strategy formulation)ব্যবসা বান্ধব নয় বরং ধুমকেতুর মত আবির্ভাব হয়ে নিজের আখের গুছিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া,সাধারন বিনিয়োগকারীদের পথে বসিয়ে দেওয়া।হায়রে কোম্পানী,হায়রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।এই কোম্পানী নিয়ে অনেক খবর পড়েছি।এই কোম্পানী সাধারন বিনিয়োগকারীদের ধরা ছোয়ার বাইরে।কি করার আছে।নিঃস্ব হয়ে গেছি।নিয়ন্ত্রক সংস্থা সাধারন বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে এই কোম্পানীকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনবে-এই প্রত্যশা।

  3. ইউয়াইটেড এয়ার উড়ুকএটাই আমাদের চাওয়া পাওয়া। সেই বন্ধ হওয়া থেকে ভাল ভাল নিউজ প্রকাশ করে আসছেন। আজ অন্য রকম প্রতিবেদন।এই কোম্পানিতে স্বপ্ন নিয়েবিনিয়োগ করেছি।কিন্তু গুড়ে বালি।৪.১৬% শেয়ার যদি মানণীয় উদ্যোক্তারা ছেড়ে দেন তাহলে ১০০% শেয়ারের মালিক হয়ে যাবেন সাধারন বিনিয়োগকারীরা। ফলেএয়ারের ষোল কলা পুর্ণ হবে।

  4. কেউ সহায়তা করছে না কেন?এত ভাল ভাল নিউজ। বিদেশিরা অধিকাংশ শেয়ার কিনে নিচ্ছে- তবুও কেউ উদ্যোক্তাদের অর্থ সহায়তা করছে না। ভরসা নেই।সাধারন বিনিয়োগকারীরা বিশ্বাস করেছে।বিশ্বাস করে এখন হায় হায় করছে,কপাল চাপড়াচ্ছে
    ।কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা এদের বিশ্বাস করে না।এরা বুদ্ধিমান

  5. ইউনাইটেড এয়ারের শেয়ারের মূল্য মাত্র ৩.৯০টাকা ।এর উদ্যোক্তারা ভাল ভাল নিউজ প্রকাশ করতে করতে বিরক্ত, ক্লান্ত।তারা বাকরুদ্ধ।ভাল ভাল নিউজ প্রকাশ করে কিন্তু ফল হয় উল্টা।সব উল্টা পাল্টা।

abul শীর্ষক প্রকাশনায় মন্তব্য করুন Cancel reply

Please enter your comment!
Please enter your name here