আশাহত এনভয় টেক্সটাইলস!

0
1740

সিনিয়র রিপোর্টার : বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র ডেনিম প্রস্তুতকারক এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেড। মূল পণ্য ডেনিম ফ্যাব্রিক্সের বাইরে সুতা উত্পাদনের জন্য ২৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে স্পিনিং মিল স্থাপন করে এনভয় টেক্সটাইলস। ২০১৬ সালের আগস্টে এর বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরু করে কোম্পানিটি।

এতে বার্ষিক নিট মুনাফায় আরো ৪০-৫০ কোটি টাকা যোগ হওয়ার কথা থাকলেও তার প্রভাব নেই প্রথম তিন প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলে। গত বছরের জুলাই-মার্চ সময়ে কোম্পানির নিট বিক্রি ১ শতাংশ বাড়লেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মুনাফা ৩৯ শতাংশ কমে গেছে।

কোম্পানির কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ঘাটতি ও অপ্রতুল গ্যাস সরবরাহের কারণে কাঙ্ক্ষিত উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি এনভয় টেক্সটাইলস। পাশাপাশি কিছু যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে কাজ না করায় উত্পাদন কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছে। ফলে নতুন ইউনিট চালু করেও এর সুফল পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

এনভয় টেক্সটাইলসের কোম্পানি সচিব এম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, উন্নত মানের ফ্যাব্রিকস উত্পাদনের জন্য ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ হিসেবে নতুন একটি স্পিনিং মিল স্থাপন করা হয়েছে। এতে কোম্পানির চলতি মুনাফার সঙ্গে আরো ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা যোগ হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। তবে গত এক বছরে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যাওয়া, উত্পাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ার কারণে উত্পাদন লক্ষ্য অনুযায়ী হয়নি।

পাশাপাশি গ্যাসের বিকল্প হিসেবে বিদ্যুতের মাধ্যমে উত্পাদন চালু রাখতে নতুন যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় জেনারেটরের ব্যবহার বেড়েছে। প্রত্যাশা অনুযায়ী কোম্পানির ব্যবসা না বাড়লেও স্পিনিং ইউনিটের জন্য নেয়া ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে আলোচ্য সময়ে কোম্পানির আয় বৃদ্ধির পরিবর্তে ব্যয় ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা বেড়ে গেছে।

২০১৬-১৭ হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, জুলাই-মার্চ সময়ে এনভয় টেক্সটাইলের পণ্য বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বা মাত্র ১ শতাংশ বেড়েছে। সদ্য সমাপ্ত হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে মোট পণ্য বিক্রি হয় ৪৪৮ কোটি টাকা, আগের বছর একই সময়ে যা ছিল ৪৪৩ কোটি টাকা। যদিও তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির বিক্রি ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বা ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়েছে।

এদিকে অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে সর্বশেষ হিসাব বছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির প্রশাসনিক, বিক্রি ও বিতরণ বাবদ পরিচালন ব্যয় ২ কোটি ২৩ লাখ টাকা বা ১১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেড়েছে। আলোচ্য সময়ে সুদ বাবদ ব্যয়ও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ কোটি ১৪ লাখ টাকা বা ৪০ দশমিক ১৬ শতাংশ বেড়েছে। সব মিলিয়ে প্রথম নয় মাসে পরিচালন ও আর্থিক ব্যয় ১১ কোটি ৩৭ লাখ টাকা বা ৫১ দশমিক ৩৪ শতাংশ বেড়েছে। ফলে আলোচ্য সময়ে এনভয় টেক্সটাইলের নিট মুনাফা ১৪ কোটি টাকা বা ৩৯ দশমিক ১৭ শতাংশ কমে গেছে। তৃতীয় প্রান্তিকেও কোম্পানিটির নিট মুনাফা ৪১ দশমিক ৮১ শতাংশ কমেছে।

সর্বশেষ প্রকাশিত ২০১৫-১৬ হিসাব বছরের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছর করপরবর্তী ৩৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মুনাফা করেছে এনভয় টেক্সটাইলস। ওই বছর বিনিয়োগকারীদের ১২ শতাংশ নগদ ও ৩ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দিয়েছে কোম্পানিটি। বছর শেষে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ছিল ২ টাকা ৩২ পয়সা।

প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৪ সালের ২০ আগস্ট ইটিএল স্পিনিং ইউনিট নামে একটি সুতা তৈরির প্রকল্প চালুর সিদ্ধান্ত নেয় এনভয় টেক্সটাইলের পর্ষদ। ময়মনসিংহের ভালুকায় জমিরদিয়ায় অবস্থিত কোম্পানিটির ডেনিম কারখানা প্রাঙ্গণে ১৭ হাজার ৫০০ টন বার্ষিক উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন স্পিনিং মিলটি স্থাপন করা হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ২০ মিলিয়ন ডলার এইচএসবিসি ও ব্র্যাক ব্যাংক অফশোর ইউনিটের মাধ্যমে পাঁচ বছরের জন্য অর্থায়ন করে। আর বাকি ১০ মিলিয়ন ডলার কোম্পানির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করার কথা। প্রকল্পের মূল মূলধনি যন্ত্রপাতি জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও জাপান থেকে আমদানি করা হয়।

ওই সময় কোম্পানিটি জানায়, নতুন ইউনিটে উত্পাদিত সিংহভাগ সুতাই নিজস্ব ফ্যাব্রিকস উত্পাদনে ব্যয় করা হবে। প্রকল্পটি চালু হলে বার্ষিক টার্নওভার ৫০ মিলিয়ন ডলার ও মুনাফা ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকা বাড়বে বলে ঘোষণা আসে। প্রকল্প হাতে নেয়ার দুই বছর পর ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট নতুন স্পিনিং মিলের উত্পাদন চালুর ঘোষণা দেয় কোম্পানিটি। ওই সময় প্রথম ধাপে দৈনিক ৩০ মেট্রিক টন সুতা উত্পাদন শুরু করে তারা।

দ্বিতীয় ধাপে ১ অক্টোবর থেকে পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় দৈনিক ৫০ টন সুতা উত্পাদনের পরিকল্পনা থাকলেও গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি নতুন যন্ত্রপাতির সঙ্গে শ্রমিক-কর্মচারীদের মানিয়ে নিতে কিছুটা সময় নেয় কোম্পানি। তবে সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতা ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশ্বের ডেনিম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব প্লান্টের স্বীকৃতি পেয়েছে এনভয় টেক্সটাইলস। বিশ্বের প্রথম ও একমাত্র ডেনিম প্রস্তুতকারক হিসেবে চলতি বছর প্লাটিনাম লিড (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) সনদে ভূষিত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। শতভাগ রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here