আরো বাড়ছে আকিজ, আবুল খায়ের ও স্কয়ার গ্রুপ

0
6857
বিশেষ প্রতিনিধি : যোগ্য উত্তরাধিকারীর মাধ্যমেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম টিকে থাকে পারিবারিক ব্যবসা। দূরদর্শী নতুন প্রজন্মের হাতে তা আরো বিকশিত হয়। দেশের শীর্ষ তিন করপোরেট প্রতিষ্ঠান আকিজ গ্রুপ, আবুল খায়ের গ্রুপ ও স্কয়ার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতারা প্রয়াত হলেও থেমে নেই ব্যবসায়িক অগ্রগতি। দ্বিতীয় প্রজন্মের হাত ধরে আরো প্রসার হচ্ছে এসব শিল্প গ্রুপ।

দেশের অন্যতম শীর্ষ করপোরেট আকিজ গ্রুপ। ২০০৬ সালে মারা যান এর প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দিন। গ্রুপের দুই ডজন প্রতিষ্ঠান ভাগ করে দিয়ে যান ১০ ছেলের মধ্যে। আকিজ গ্রুপ এখন দুই ভাগে ভাগ হলেও গত ১০ বছরে এর প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিন ডজনের বেশি। একই সঙ্গে বেড়েছে বার্ষিক টার্নওভার ও প্রতিষ্ঠানে জনবলের সংখ্যা। ২০০৬ সালে আকিজ গ্রুপে ৪০ হাজার জনবল থাকলেও এখন তা বেড়ে হয়েছে ৬০ হাজারের বেশি।

আকিজ গ্রুপের দাবি, ৪০ বছর ধরে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে গ্রুপটি। এ গ্রুপে প্রায় ৬০ হাজার শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা কাজ করছেন। গ্রুপটির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য করছে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। এ গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় কোষাগারে রাজস্ব জমা দিচ্ছে বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা।

পাট, বেভারেজ ও টোব্যাকো খাতের নেতৃত্বে রয়েছে আকিজ গ্রুপ। দেশের সবচেয়ে বড় জুট মিলটিও এখন তাদের। বেভারেজের পাশাপাশি গ্রুপের ঢাকা টোব্যাকোও এখন দেশের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান।

গত ১০ বছরে আকিজ গ্রুপে যোগ হয়েছে বেশ কয়েকটি নতুন প্রতিষ্ঠান। আকিজ ফ্লাওয়ার মিলস, আকিজ শিপিং লাইন, পারফেক্ট টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড এর অন্যতম। এছাড়া এ সময়ে বড় ধরনের সম্প্রসারণ হয়েছে ঢাকা টোব্যাকো লিমিটেড, আকিজ সিরামিকস ইন্ডাস্ট্রিজ, আকিজ পার্টিকেল বোর্ড লিমিটেড ও আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের। এসব প্রতিষ্ঠানের উত্পাদনক্ষমতা বেড়েছে তিন-পাঁচ গুণ।

সাফল্যের পেছনে বাবার রেখে যাওয়া নীতিকেই বড় করে দেখছেন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ বশির উদ্দিন। তিনি বলেন, বাবার রেখে যাওয়া ব্যবসা তারা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য-সম্পদ সবকিছুই বাবার অবদান। বাবার শেখানো নিয়ম-নীতি মেনে তারা ব্যবসা করছেন। চেষ্টা করে যাচ্ছেন একে আরো বিকশিত করার।

তিনি বলেন, আকিজ গ্রুপের পরিবেশক, কর্মী বাহিনী, ব্যবস্থাপনাসহ সামগ্রিক ব্যবসায়িক নীতিতে গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতার একটা বড় প্রভাব রয়েছে। তার বাবার অনুপস্থিতিতেও সবকিছু তার মতো করেই চলছে।

বিড়ি ব্যবসায়ী আবুল খায়েরের হাত ধরে আবুল খায়ের গ্রুপের যাত্রা। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকায় আবুল বিড়ি কোম্পানি থেকেই এ গ্রুপের ব্যবসা শুরু। ১৯৫৩ সালে বিড়ি ব্যবসা দিয়ে যাত্রা হয় গ্রুপটির। ১৯৭৮ সালে এর প্রতিষ্ঠাতা আবুল খায়ের মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিড়ি ও ট্রেডিংই ছিল তাদের মূল ব্যবসা। এর পর একে একে গ্রুপে যোগ হয়েছে এক ডজনের বেশি মাঝারি ও ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

পুরনো তামাক ব্যবসা না ছেড়েই আবুল খায়েরের উত্তরসূরিরা গড়ে তুলেছেন স্টিল মিল, সিমেন্ট কারখানা, চা বাগান, ডেইরি প্রডাক্টসহ অনেক প্রতিষ্ঠান। এসব অর্জনে প্রভাবক হিসেবে রয়েছেন গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম।

১৯৯৩ সালে আবুল খায়ের গ্রুপ স্টারশিপ কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে দুগ্ধ খাতে নাম লেখায়। এর পর ১৯৯৬ সালে যোগ হয় স্টারশিপ ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার। ১৯৯৭ সালে আসে মার্কস ফুল ক্রিম মিল্ক পাউডার। আর সিলন চা নিয়ে বাজারে আসে ২০০৪ সালে।

ভারী শিল্পে রয়েছে আবুল খায়েরের আধিপত্য। দেশের সিমেন্ট খাতের বেশির ভাগ চাহিদা পূরণে সক্ষম আবুল খায়েরের প্রতিষ্ঠান শাহ সিমেন্ট। প্রতিষ্ঠানটির বার্ষিক উত্পাদনক্ষমতা ৫০ লাখ টন। দেশে বিদেশী কয়েকটি সিমেন্ট কোম্পানি থাকলেও তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যবসা করছে শাহ সিমেন্ট।

১৯৯৩ সালে আবুল খায়ের গরু মার্কা ঢেউটিন দিয়ে ইস্পাত শিল্পে নাম লেখায়। এর পর প্রতিষ্ঠানটি করুগেটেড কালার কোটেড ঢেউটিন উত্পাদন শুরু করে, যা বর্তমানে ২০টির বেশি দেশে রফতানি হচ্ছে। অতিসম্প্রতি তারা বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে একেএস টিএমটি ৫০০ডব্লিউ ইস্পাতের রড উত্পাদনে।

দ্বিতীয় প্রজন্মই আবুল খায়ের গ্রুপের বড় শক্তি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এ প্রজন্মের হাত ধরেই গ্রুপের ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। ব্যবসায় শতভাগ করপোরেট সংস্কৃতি চালু করেছেন তারা। প্রতিষ্ঠানের বড় দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছেন দেশী-বিদেশী দক্ষ নির্বাহীদের। ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, আকিজ গ্রুপ ও আবুল খায়ের গ্রুপ তাদের বড় গ্রাহক।

দুটি গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতারা তাদের প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সংস্কৃতি চালু করে গেছেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছেন। তাছাড়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতারা উত্তরাধিকারদের ব্যবসা পরিচালনার রীতিনীতি হাতে-কলমে শিখিয়েছেন। এ কারণে তাদের অবর্তমানেও গ্রুপ দুটি কোনো ধরনের সংকটে পড়েনি, বরং দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃত্বে তা আরো প্রসারিত হয়েছে।

স্কয়ারের শুরুটা ১৯৫৮ সালে। তিন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে কারখানা স্থাপন করেন স্যামসন এইচ চৌধুরী। ২০১২ সালে স্যামসন এইচ চৌধুরী প্রয়াত হলেও প্রতিষ্ঠান চলছে আপন গতিতে। গত চার বছরেও সংকটে পড়েনি গ্রুপটি। গ্রুপের সব পণ্যের সুনাম অক্ষুণ্ন রয়েছে। গ্রুপের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন স্যামসন এইচ চৌধুরীর জ্যেষ্ঠ পুত্র স্যামুয়েল এস চৌধুরী।

বাবার অবর্তমানেও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন সন্তানরা। স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবদ্দশায় ২০০৬ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত গ্রুপের মূল প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মার বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ছিল ১৭ দশমিক ৫১ শতাংশ। পরবর্তী তিন বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৮৮ শতাংশে। চলতি হিসাব বছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে কোম্পানিটির মুনাফার প্রবৃদ্ধি আরো বেড়েছে। ২০১৪ সালে পুরো ফার্মাসিউটিক্যালস খাত যেখানে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করে, সেখানে স্কয়ার ফার্মার প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।

দেশের শেয়ারবাজারে মূলধনে শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্কয়ার ফার্মার অবস্থান তৃতীয়। বুধবার কোম্পানির বাজার মূলধন ছিল ১৬ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। গুণগত মানের কারণে সম্প্রতি স্কয়ার যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) সনদও পেয়েছে।

স্কয়ার ফার্মার সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফর্মুলেশন ছাড়াও স্কয়ার টেক্সটাইলস, স্কয়ার ফ্যাশনস ও স্কয়ার হসপিটাল লিমিটেড নামে তিনটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে গ্রুপটির। এর বাইরে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, মাছরাঙা টেলিভিশনসহ ২৪টি সিস্টার কনসার্নও রয়েছে। অংশীদারিত্ব রয়েছে ব্যাংক ও বীমা ব্যবসায়।

স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের অধীন মসলা ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য বাজারজাত করা হয় রাঁধুনী, রুচি ও চাষী ব্র্যান্ডের মাধ্যমে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট খাতে এটি মার্কেট লিডার হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। এছাড়া স্কয়ার টয়লেট্রিজের অধীন বিভিন্ন প্রসাধনসামগ্রী উত্পাদন ও বাজারজাত করা হয়। এরই মধ্যে স্কয়ার হাসপাতাল দেশের শীর্ষস্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। ইউনাইটেড হাসপাতালেও বিনিয়োগ রয়েছে স্কয়ার ফার্মার।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়ায় নিয়মিতভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে স্কয়ার ফার্মা। বর্তমানে কোম্পানিটি তার উত্পাদন সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে। পাবনা ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরে কারখানার উত্পাদনক্ষমতা, দক্ষতা এবং পরিমাণ ও গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার স্কয়ার ফার্মার প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।

২০১৪ সালে কোম্পানিটি ৩৫টি নতুন পণ্য যুক্ত করে। বর্তমানে কোম্পানিটি মোট ৭৬৮ ধরনের ওষুধ উৎপাদন করছে। এর মধ্যে ট্যাবলেট ৩০৭ ও ক্যাপসুল ৬৩ ধরনের। এছাড়া লিকুইড ৭৮ ও ইনজেক্টেবল ৬৪ ধরনের।

বর্তমানে দেশের ওষুধ বাজারের ৯০ শতাংশ দখলে রয়েছে স্থানীয় কোম্পানিগুলো। স্কয়ার ফার্মার দখলে রয়েছে এ বাজারের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।

স্কয়ার গ্রুপের সঙ্গে এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলেও আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সাবেক ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদ মামুন রশীদ বলেন, স্কয়ারের প্রতিষ্ঠাতা স্যামসন এইচ চৌধুরীর ঠিক করে দেয়া ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায়িক নীতি অনুযায়ীই চলছে প্রতিষ্ঠানটি। স্যামসন এইচ চৌধুরীর ছেলেরা এখন এটি পরিচালনা করলেও তাদের বাবার আদর্শেই এটি চলছে। তিনি বলেন, স্কয়ার তার জনবলকে খুবই মর্যাদা দিয়ে থাকে। এটি স্কয়ারের বড় শক্তি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here