আমার প্রত্যেক বাজেটই নির্বাচনী বাজেট : অর্থমন্ত্রী

0
102

সিনিয়র রিপোর্টার : অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আমার প্রত্যেক বাজেটই নির্বাচনী বাজেট। আমি একটি দলের সদস্য। শুধু সদস্য নই, গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। দলের নীতিনির্ধারণে আমি ভূমিকা রাখি। তাই আমার প্রতিটি বাজেটই রাজনৈতিক বাজেট হবে, নির্বাচনী বাজেট হবে। এটাই স্বাভাবিক।

শুক্রবার রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে বাজেট পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের বাস্তবসম্মত ব্যবহারের কারণে দেশে বিনিয়োগ কম হলেও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী, অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবীর, অর্থ সচিব মুসলিম চৌধুরী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, ইআরডি সচিব শফিকুল আজম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

বাজেটে আয়কর প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, আমি আগেই বলেছিলাম এবারের বাজেটে নতুন করে কর দেয়া হবে না। তা রাখতে পেরেছি। দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এক সময়ের দরিদ্র, অনাহারি, অভাবী মানুষের দেশ এখন উন্নত দেশে পরিণত হয়েছে। গ্রামে এখন মানুষ সুখে বাস করছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, এবারের বাজেটে আমরা যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি, সেটা ঠিকই আছে এবং আশা করি কোনো সমস্যা হবে না। তবে বাজেট ঘাটতি দিন দিন কমে আসছে। আগামীতে আরো কমবে। গত ২০ বছর ধরে উচ্চতর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। এর মূল নায়ক বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ দিকে ভার্চুয়াল ব্যবসায় ভ্যাট থাকলেও অনলাইন কেনাকাটায় ভ্যাট নেই বলে জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, অনেকেই এই বাজেটকে নির্বাচনী বাজেট বলছেন। সাধারণত প্রতি বছর নির্বাচনের হাওয়া এপ্রিলেই লেগে যায়। এবার এই হাওয়া লাগতে একটু দেরি হয়েছে। এটা দেশের জন্য ভালো। কারণ হাওয়া কম হলে কাজে বাধা আসবে না। কাজ বেশি হবে। এখনো নির্বাচনের হাওয়া শুরু না হওয়ায় নির্বাচনের বছরের বাজেট বাস্তবায়ন ততটা খারাপ হবে না। এটা দেশের জন্য সুখবর।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘ভুয়া’ অভিহিত করা হয়েছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, এই বাজেট কীভাবে ভুয়া হতে পারে? কিছু নির্বোধ ছাড়া এটা আর কেউ বলতে পারে না। যারা এই বাজেটকে ভুয়া বলছেন, তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন আছে।

শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

রাজস্ব আহরণের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ব্যাপারে এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, লক্ষ্যমাত্রা হলো একটা এস্টিমেট। অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে এই লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়। বাজেট করতে গিয়ে অনেক ধরনের ঘাটতি থাকে, সমস্যা থাকে। আমরা সেগুলোকেও বিবেচনায় নিয়ে বাজেট তৈরি করি এবং বাস্তবায়নও করি।

সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশে বিদ্যমান করপোরেট করহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিকভাবে কোনো দেশেই করপোরেট করের হার এত বেশি না। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির করপোরেট করের হার কমানো হয়নি। ব্যাংক খাতকে সুবিধা দেয়ার জন্যই এটা করা হয়েছে কিনা?

এ প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, এর আগে আমাদের ব্যাংকের জন্যও করপোরেট করের হার ছিল ৪০ শতাংশ। এটাকে কমিয়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশে নিয়ে এসেছি। তবে আন্তর্জাতিকভাবে করপোরেট করের হার এত বেশি নয়। ৪০ শতাংশের ওপরে করপোরেট করহার খুব কম দেশেই আছে। আমরাও একে কমিয়ে আনার চেষ্টা করছি। তবে মোবাইলসহ কয়েকটি কোম্পানি ছাড়া বাকি কোম্পানিগুলোর জন্য এটা যেমন ছিল তেমনই থাকবে। যেসব কোম্পানি ৪০ শতাংশের কম হারে করপোরেট কর দেয়, তাদেরটা কেন কমাব? তবে ধীরে ধীরে সার্বিকভাবে করপোরেট করের হার কমিয়ে আনা হবে।

শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, ভার্চুয়াল ব্যবসায় ভ্যাট থাকলেও অনলাইন কেনাকাটায় ভ্যাট নেই। আগামী অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে পণ্য বা সেবা কেনার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাট বসানোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় অর্থমন্ত্রীর কাছে। সেই প্রশ্নের জবাব স্পষ্ট করেন এনবিআর চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, ভার্চুয়াল ব্যবসা ও অনলাইনে কেনাকাটার বিষয়টি আমরা আলাদা করেছি। এ ক্ষেত্রে এই বাজেটে ভার্চুয়াল ব্যবসার ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট বসানো হয়েছে। তবে অনলাইনে কেনাকাটা এর আওতার বাইরে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মচারীরা এখন যেসব সুবিধা ভোগ করছেন, তারা জীবনে কখনো এমন সুযোগ-সুবিধা পাননি। তাদের বেতন ৪০ হাজার থেকে এক লাফে ৮২ হাজার টাকা হয়েছে। তাদের পেনশনে বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে ইনক্রিমেন্ট দেয়া হয়েছে। এর আগে তারা কখনোই এমন সুযোগ পাননি। আমার মনে হয় তাদের আর দাবি নেই।

বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাজেট নয়, প্রশ্নের মাধ্যমে অহেতুক সমালোচনা করা হচ্ছে। এসব প্রশ্ন যারা করেন, তারা দেশের কোনো উন্নয়ন দেখতে পারেন না।

আরেক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে এখন দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশ। আপনাদের যখন জন্ম হয়েছে কিংবা জন্মের আগে, দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৭০ শতাংশ। বোঝেন, কোথায় ছিল বাংলাদেশ এবং এখন কোথায় এসেছে? এই কিছু দিন আগে দেশে ৩০ শতাংশ মানুষ ছিল গরিব। ৭ বছর আগে সাড়ে ৩০ শতাংশ দরিদ্র ছিল, আজ ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। যারা চূড়ান্ত গরিব, তাদের সংখ্যা ছিল ১৮ শতাংশ। এখন ১১ শতাংশ। কোন মুখে আপনারা বলেন, এই দেশে গরিব মারার বাজেট হচ্ছে, ধনীকে তেল দেয়ার বাজেট হচ্ছে? বলেননি, কিন্তু বোঝাতে চাচ্ছেন দেশের উন্নয়ন কিছুই হয়নি।

তিনি বলেন, আপনারা বাজেট দেখেননি। আপনারা কোনোভাবেই এই বাজেটের সমালোচনা করতে আসেননি এখানে। আপনাদের কিছু গৎ বাঁধা প্রশ্ন আছে। সেই প্রশ্ন করতেই এখানে এসেছেন।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, সঞ্চয়পত্রে বর্তমানে যে মুনাফা আসে, এই হার স্থায়ী না। এটা ২-৩ বছর পরপর রিভিউ হয়। বাজেটের পর এটা নিয়ে আবার বসব। আবার এর হার নিয়ে রিভিউ করব। দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর জন্য যেসব দেশে ১২ হাজার শ্রমিকের উপস্থিতি থাকবে, সেখানেই নতুন অফিস খোলার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যে দেশে আমাদের ১২ হাজার শ্রমিক আছে বা থাকবে, সেই দেশেই নতুন শ্রম অফিস খোলা হবে। সে লক্ষ্যে আমরা এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমিত সম্পদের বাস্তবসম্মত ব্যবহারের কারণে বিনিয়োগ কম হলেও প্রবৃদ্ধি বেড়েছে।

বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে- এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ১২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এটা একবারে নয়, ২০২৪ সাল পর্যন্ত নেয়া হবে। বাকি থাকে ২০ বিলিয়ন ডলার। তা খুব বেশি নয়। এ ছাড়াও ঋণ পরিশোধেও আমরা খুব ভালো অবস্থানে আছি। এটা রেকর্ড। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই।

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে যোগ করেন ইআরডি সচিব শফিকুর আজম। তিনি বলে, বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ১৯৮ মার্কিন ডলার। এই মুহূর্তে ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক ঋণ জমা আছে। প্রতি বছর ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হয়, যা মোটেও ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

তিনি আরও বলেন, এ বছর ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ ছাড় হবে। ১ বিলিয়ন পরিশোধের পরও আমাদের হাতে ৫ বিলিয়ন ডলার জমা থাকবে। ইআরডি সচিব জানান, প্রতি বছর আমাদের ২ হাজার কোটি টাকা সুদ দিতে হয়, যা খুবই নমিনাল।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে রোহিঙ্গাদের জন্য ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও পুরো টাকা খরচ করতে হবে না। রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় করা অর্থ এ পর্যন্ত বিদেশি অনুদান থেকে পাওয়া গেছে। এটি আগামী বছরও পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। এ ছাড়া রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যয় করা অর্থের সংস্থান করতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে কথা হচ্ছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদের হার নামিয়ে আনতে ব্যাংকিং খাতকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। ব্যাংক বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ছাড় দেয়ার উদ্দেশ্য হলো সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা। সুদের হার কম হলে ব্যবসায়ীরা ব্যবসা বাড়াতে পারবেন। তাতে বিনিয়োগ বাড়বে। দেশের অর্থনীতি এগিয়ে যাবে। আমরা যে সম্পদ আরোহণ করি তার ব্যবহার খুব ভালো তাই হাই প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।

শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা

তিনি আরও বলেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার এগিয়ে আছে। গত বছর সরকার দেশে ১৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। আমরা ১০ লাখ লোককে বিদেশে পাঠিয়েছি। যারা এক সময় গৃহে কাজ করতেন, যাদের কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দেয়া হতো না, এমন প্রায় ১৩ লাখ মানুষকে কর্মসংস্থানের আওতায় আনা হয়েছে। যে পরিমাণ জনগোষ্ঠী কর্মজীবনে আছেন, তার চেয়ে বেশি জনগোষ্ঠীকে আমরা কর্মসংস্থানের আওতায় আনতে পেরেছি, এটি আমাদের বড় অর্জন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, এক সময় যে পাশ্চাত্য আমাদের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ ও ‘হতাশার ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল, আমাদের অগ্রগতি দেখে তারাই এখন প্রশংসা করছে। জাতিসংঘের মহাসচিব ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে ‘উন্নয়নের রোলমডেল’ আখ্যা দিয়েছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here