‘কোম্পানি আইনের খসড়া নিয়ে কিছুটা দ্বিধা আছে’

0
497

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর। মন্ত্রিপরিষদ সভায় অনুমোদিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের খসড়া নিয়ে তিনি কথা বলেছেন। এতে উঠে এসেছে ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংকের কার্যক্রমসহ নানা প্রসঙ্গ। তাঁর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন –সানাউল্লাহ সাকিব

  • ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে টানা নয় বছর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা কি যৌক্তিক?মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: এই সিদ্ধান্ত কিন্তু হঠাৎ করে আসেনি। কয়েক মাস আগে থেকেই এটা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও চলছে। ব্যাংক খাতটা আমাদের দেশে বেশ আলোচিত, সমালোচিতও। ব্যাংক খাত কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ধমনি হিসেবে কাজ করে। সরকার মনে করলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সংস্কার করতেই পারে।

    তবে ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ছয় বছর থেকে বাড়িয়ে নয় বছর করায় আমার কিছুটা দ্বিধা আছে। আমি মনে করি, সরকার বিষয়টা পুনর্বিবেচনা করবে। পরিচালকদের ছয় বছর দায়িত্ব পালন শেষে এক বা দুই বছর বিরতির পর আবার নতুন করে দায়িত্বের সুযোগ দিতে পারে। বর্তমানে দুই মেয়াদে ছয় বছরের দায়িত্ব শেষে তিন বছর বিরতি আছে।

  • ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবার থেকে চারজনকে রাখার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে ব্যাংকগুলো একেকটি পরিবারের কাছে কুক্ষিগত হয়ে পড়বে কি না?মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: একসময় এক পরিবার থেকে একজন পরিচালক হতে পারতেন, পরে তা দুজন করা হয়। এখন চারজন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে বিষয়টিকে আমি ভিন্নভাবে দেখি। পরিচালনা পর্ষদে অনধিক ২৫ শতাংশ উদ্যোক্তা এক পরিবার থেকে এলে যৌক্তিক ও ভারসাম্যমূলক হবে। যেমন ২০ জন পরিচালক থাকলে ৪ জন এক পরিবার থেকে আসবেন। এতে এক পরিবার থেকে ৪ জন এলেও ৭৫ শতাংশের অংশ বেড়ে যাবে। এতে সবার অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।

আরও বলতে চাই, তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালককে এই হিসাবের বাইরে রাখতে হবে। বলতে দ্বিধা নেই, ব্যাংক ও বিমা খাতে এমন স্বতন্ত্র পরিচালকও করা হয়েছে, যা দেখে আমি লজ্জা পেয়েছি।কীভাবে তাঁরা স্বতন্ত্র পরিচালক হলেন? এ ক্ষেত্রে ন্যূনতম যোগ্যতা সংজ্ঞায়িত হলে ব্যাংকব্যবস্থা আরও ভালো হবে। স্বতন্ত্র পরিচালকেরা সাধারণ শেয়ারহোল্ডার ও আমানতকারীদের স্বার্থ দেখবেন। তবে অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সম্মানী অত্যন্ত নগণ্য। তাই তাঁদের থেকে নির্মোহ, সৎ ও সাহসী মতামত পেতে চাইলে সম্মানী বাড়াতে হবে।

  • বর্তমান পরিচালকদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে আইনও পরিবর্তনের দাবি উঠেছে এবং তা হতেযাচ্ছে। আইন সংশোধন হলে তাঁরা আবার নতুনভাবে মেয়াদ শুরু করবেন। ফলে একজন পরিচালক আজীবনই পদে থেকে যাচ্ছেন। বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: উদ্যোক্তারা স্বাভাবিকভাবে ব্যাংকে থাকতে চাইবেন, এর মধ্যে তো কিছু সুযোগ-সুবিধা আছেই। সরকার তো সব বিষয় খেয়াল রাখবে না। তবে বিধি করার সময় খুব সচেতনভাবে পরিষ্কার করে বলতে হবে, প্রথম যেদিন পরিচালক হবেন, সেদিন থেকেই মেয়াদ গণনা শুরু হবে, আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকে নয়। এটা সূক্ষ্ম বিষয়, যাঁরা প্রজ্ঞাপন জারি করেন, তাঁদেরই খেয়াল রাখতে হবে।

  • আইনটি সংশোধনে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত উপেক্ষা করে উদ্যোক্তাদের দাবি মানা হয়েছে। এতে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ওপর কি বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকবে?

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: গণমাধ্যমের খবরে বারবার প্রচারিত হচ্ছে, সরকারি ব্যাংকে অনিয়ম হচ্ছে। তবে সরকারি ব্যাংক অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে, সে অনুযায়ী বাহবা তারা পাচ্ছে না। মুদ্রানীতি ও ব্যাংক তদারকিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা রয়েছে। তাদের সুপারিশ আমলে না নিলে নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠানটিকে নিজস্ব কর্মকাণ্ড নিয়ে ভাবতে হবে। বেসরকারি ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পুরো নিয়ন্ত্রণ আছে। এরপরও খবর পাওয়া যায় যে এসব ব্যাংকেও অনিয়ম হচ্ছে। তাহলে তো প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ ব্যাংক কী করছে?

  •  নতুন অনুমোদন দেওয়া দুটি ব্যাংকে বড় অনিয়ম হচ্ছে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে এসেছে। কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার খবর মিলছে না।

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: ভালোমতো তদারকি থাকলে কোনো অনিয়ম হওয়ার কথা নয়। মনে হয়ে, সিস্টেমে কোনো গলদ আছে। আমার জানামতে, আগে বাংলাদেশ ব্যাংক অনিয়মের প্রমাণ পেলে একই দিনে ব্যবস্থা নিত। এমনটা হলে কিন্তু কোনো গোলযোগ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

আমি শুনেছি, এখন অনিয়ম-সংক্রান্ত তদন্ত রিপোর্ট ড্রয়ারে চলে যায়। এই দোষ তো আমি সিস্টেম বা সরকারকে দিতে পারব না। পক্ষান্তরে তিনটি সরকারি ব্যাংকের এমডি নিয়োগের পর আমরা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলাম যে অবস্থার উন্নতি হবে, বেশ হয়েছেও। বাংলাদেশ ব্যাংক কিন্তু চাইলেই ব্যবস্থা নিতে পারে। অগ্রণী ব্যাংকের আগের এমডিকে সরিয়ে দিয়েছে, সরকার তো কোনো বাধা দেয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশদভাবে নিজেদের যুক্তি তুলে ধরে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনো নথি যাতে তদবিরের মাধ্যমে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আমি মনে করি, সোনালী ব্যাংককে শক্তিশালী করে অন্য তিন ব্যাংককে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া উচিত। এর জন্য ব্যাংকগুলোকে সম্পদ ও দায় হিসাব করে শেয়ারবাজারে ছেড়ে দেওয়া উচিত। এক অর্থবছরে না করে কয়েক অর্থবছরে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর শেয়ারের অভিহিত মূল্য বাস্তবধর্মী হতে হবে এবং জনসাধারণের শেয়ার কারচুপি করে বিত্তবানেরা যেন কুক্ষিগত করতে না পারেন, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব কাজ করে। তাহলেই এসব ব্যাংক ভালো করবে। এ ছাড়া প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। হঠাৎ করেই দেশের ব্যাংক-ব্যবস্থা বড় হয়ে গেছে। সে তুলনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সক্ষমতা বাড়েনি। কাজ করতে ইচ্ছুক কর্মকর্তাদের দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

  •  দেশের ব্যাংক-ব্যবস্থায় সুশাসন নিশ্চিতে এই মুহূর্তে করণীয় কী?

মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন: বাংলাদেশে ১৯৯৯ সালে একটি ব্যাংক সংস্কার কমিটি হয়েছিল। এখন দরকার একটা কমিশন; কমিটি দিয়ে আর হবে না। বাজেটে কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। সময়ও দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা হয়নি। আমে মনে করি, একটা যোগ্যতাসম্পন্ন অর্থ ও ব্যাংক সংস্কার কমিশন গঠন করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে এসব বিষয়ে আলোচনা হবে। মাঝে মাঝে যেসব সমস্যা দেখা দেয়, সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখে সবার কাছে যুক্তিযুক্ত হয় এমন সমাধান দেওয়া সম্ভব।

  • সূত্র : প্রথম আলো

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here