সিনিয়র রিপোর্টার : দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দিন দিন বেড়েই চলছে। আর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুর্বার গতিতে বাড়ছে। এসব ঋণের সিংহভাগই পরিচালকাদের নিয়ন্ত্রণে থেকে খেলাপি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে জুন পর্যন্ত মোট ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে পরিচালকরা যে ঋণ নিয়েছেন তা মোট ঋণ বিতরণের প্রায় ১৪ দশমিক ২২ শতাংশ। তবে পরিচালকদের ঋণের প্রকৃত হিসাব এর চেয়ে অনেক বেশি।

এদিকে, ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিচালকদের কাছে ব্যাংক খাত পুরোপুরি জিম্মি। পরিচালকরাই ব্যাংক ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করেন। তারা ব্যাংকের আমানত পর্যন্ত খেয়ে ফেলছেন। যাদের নিজেদের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে, তাদের কাছে ব্যাংক কোনো সেবামূলক লাভজনক প্রতিষ্ঠান নয়, এটিকে তারা ধরে নিয়েছেন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা হাতিয়ে নেয়ার মেশিন হিসেবে।

ব্যাংকের পরিচালক বা মালিক বলতে এখন যা বোঝায় তা হল, সাধারণ মানুষ নিরাপত্তার প্রশ্নে ব্যাংকে তাদের আমানত রাখবেন, আর ঋণ দেখিয়ে সে টাকা নিজেরা ভাগাভাগি করে নেবেন। আবার ঋণ খেলাপি হয়ে তা একপর্যায়ে অবলোপন করে অদৃশ্য করা হবে।

এসব কারণে বেশ কিছু ব্যাংকের ভেতরের অবস্থা খুবই নাজুক। তাদের আশঙ্কা, এক সময় ভেতরের খোলস বেরিয়ে এলে বহু আমানতকারীকে পথে বসতে হবে। আর ব্যাংকের পরিচালক হয়েও যারা ঋণ নিচ্ছেন তাদের কোনো চিন্তা নেই। পরিস্থিতি খারাপ দেখলে সপরিবারে বিদেশে সটকে পড়বেন। ভবিষ্যতে এমন আশঙ্কার কথা মাথায় রেখে তাদের প্রত্যেকে বিদেশে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার করে নিয়ে গেছেন। সেখানে তারা বাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনা থেকে শুরু করে নানা খাতে বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগ করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংক খাতে মোট ঋণ বিতরণ করা হয়েছে ৭ লাখ ৩১ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১ লাখ ৬ হাজার ১৯৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন ব্যাংক মালিকরা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১৪ দশমিক ২২ শতাংশ।

প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, এর মধ্যে শুধু এক ব্যাংকের পরিচালক অপর ব্যাংকের পরিচালকের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঋণ নিয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। যা ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ বিতরণের ১৪ দশমিক ১০ শতাংশ।

বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী গত জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের প্রায় সবক’টি ব্যাংকের পরিচালকরা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ঋণ দেয়া-নেয়া করেছেন।

এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক প্রায় ৬ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৫ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া ৪ হাজার ৪৩ কোটি টাকা, যমুনা ব্যাংক ৪ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংক ৪ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৪ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক ৩ হাজার ৬৭১ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা, ইউসিবিএল ৩ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা, এমটিবিএল ৩ হাজার ৮২ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ৩ হাজার ৪০ কোটি টাকা, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ১৪২ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ২ হাজার ২৩ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ২ হাজার ৫ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য।

এদিকে সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করছে। এসব ব্যাংকের পরিচালকরা সরাসরি ব্যাংকের মালিক না হলেও পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে যথারীতি ব্যাংক মালিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বাস্তবতা হল, তাদের ঋণ অনিয়ম করার সুযোগ বেশি।

অন্যান্য ব্যাংকের পরিচালকরাও খুব সহজে তাদের কাছ থেকে ঋণ নিতে পেরেছেন। এছাড়া কেউ কেউ ঋণের গ্যারান্টার হয়েও ঋণ দিয়েছেন। তাই এমন চরিত্রের পরিচালকরা সরাসরি নিজেরা ঋণ না নিলেও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বড় অংকের ঋণ দিয়ে গোপনে কমিশন ভাগাভাগি করে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়ে গেছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ব্যাংক থেকে তুমি ঋণ নাও- দিতে হবে না আর, তোমার ব্যাংক থেকেও আমি ঋণ নেব; কিন্তু ফেরত দেব না। এ ধরনের যোগসাজশের ব্যাংকিং খুবই ভয়াবহ নজির।’

তিনি বলেন, ব্যাংক পরিচালকদের যোগসাজশের এ লেনদেন বন্ধ করতে হবে। তিনি মনে করেন, ‘কানেক্টিং’ বা যোগসাজশের লেনদেন বন্ধ করতে না পারলে আমানতকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে, যা ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলবে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এটা ব্যাংক খাতের জন্য অশনিসংকেত। কিন্তু বাস্তবতা হল, আইন করে বন্ধ করা যাবে না। তিনি বলেন, ব্যাংকের মালিকরা সৎ না হলে এটা বন্ধ হবে না। এভাবে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here