আমানতের সুদহার কমালেও অনেক ব্যাংকে ঋণের সুদহার কমেনি

0
335

স্টাফ রিপোর্টার : চলতি মাসের পাঁচ কার্যদিবস শেষ হয়েছে।রবিবার ছিল দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস। অথচ ব্যাংক মালিকরা সিদ্ধান্ত নিলেও এ সময়ের মধ্যে অধিকাংশ ব্যাংকই ঋণের সুদের হার কমায়নি। ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে কমাতে গিয়ে কোনো কোনো ব্যাংক শুধুমাত্র কৃষি ঋণে ৯ শতাংশ সুদহার নির্ধারণ করেছে।

কিন্তু ঋণের বিপরীতে রয়ে গেছে নানা ধরনের কমিশন, ফি ও চার্জ। এসব কারণে ঋণের ঘোষিত সুদ ৯ শতাংশ হলেও বাস্তবে এই হার ১১ থেকে ১২ শতাংশ হবে। বেশিরভাগ ব্যাংকই এখনো ঋণের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দেয়নি।

জানা গেছে, ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট (নগদ টাকার সংকট) উত্তরণ করে সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য সম্প্রতি সরকারের কাছ থেকে চার ধরনের সুবিধা নিয়েছেন বেসরকারি ব্যাংকের মালিকরা। এর বিনিময়ে ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানোর তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। তখন ব্যাংক মালিকরা কথাও দিয়েছিলেন। এর অংশ হিসেবে গত ১ জুলাই থেকে ৯ শতাংশের বেশি সুদ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বেসরকারি ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (বিএবি)।

কিন্তু গত এক সপ্তাহ পার হলেও অনেক ব্যাংকই ভোক্তাঋণের ওপর সুদ হার কমায়নি। যদিও ঘোষণা ছিল সব ঋণের ক্ষেত্রেই সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হবে। কিন্তু কোনো কোনো ব্যাংক মেয়াদি ঋণ, চলতি মূলধন ঋণ, গৃহঋণ, ব্যবসায় বিনিয়োগে নতুন যে সুদহার নির্ধারণ করেছে তা সর্বনিম্ন সাড়ে ১০ শতাংশ। ভোক্তাঋণের সুদহার ১৩ শতাংশ। কোনো ব্যাংকই পুরোপুরি সব খাতের জন্য সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার নির্ধারণ করেনি।

এ বিষয়ে ব্যাংক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিএবি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার বলেন, ঋণ ও আমানতের সুদহার ৯ ও ৬ শতাংশ করার সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতভাবেই নেয়া হয়েছে। সব ধরনের ঋণের ক্ষেত্রেই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হবেই।

জানা যায়, সরকারি খাতের সোনালী, অগ্রণী, জনতা ও রূপালী ব্যাংক আমানত ও ঋণের সুদের হার কমিয়েছে। এর মধ্যে জনতা ও সোনালী ব্যাংক প্রায় সব ধরনের সুদের ৯ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে এনেছে। আমানতের সুদের হারও তারা কমিয়ে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত রেখেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই হার ৬ শতাংশের মধ্যে রয়েছে।

বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি, এশিয়া, ব্র্যাক, ওয়ান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, ইস্টার্ন, প্রাইমসহ আরো কয়েকটি ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমায়নি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এবি ব্যাংক সুদের নতুন হার ৩ জুলাই থেকে কার্যকর করেছে। তারা কৃষিঋণ ছাড়া সব ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের উপরে রেখেছে। এই হার আগে থেকেই ৯ শতাংশ রয়েছে।

তারা মেয়াদি শিল্প ঋণের সুদের হার ভালো গ্রাহকদের জন্য সাড়ে ৯ থেকে ১২ শতাংশ এবং অন্য গ্রাহকদের জন্য ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, চলতি মূলধন বড় শিল্পে ৯ থেকে ১২ শতাংশ, মাঝারি শিল্পে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ, ক্ষুদ্র শিল্পে সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে। ব্যাংক এশিয়া শিল্প ঋণের সুদের হার সাড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ এবং চলতি মূলধনে ১০ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে।

অন্যান্য ঋণে সুদের হার আরো বেশি রেখেছে। ব্র্যাক ব্যাংক ৩ জুলাই থেকে আমানতের নতুন হার কার্যকর করেছে। তারা আমানতের বিপরীতে সর্বোচ্চ সুদ দেবে ৮ শতাংশ। সুদের হারও কমিয়ে আনবে, তবে এখনো ঘোষণা দেয়া হয়নি। ইস্টার্ন ব্যাংক ২ জুলাই থেকে আমানতের সুদের হার কমিয়ে সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৯ শতাংশে নামিয়ে এনেছে।

কিন্তু ঋণের সুদের হার কমানোর ঘোষণা দেয়নি। আইএফআইসি ব্যাংক গত ২৮ জুন ঋণ ও আমানতের নতুন সুদহার নির্ধারণ করে ১ জুলাই থেকে কার্যকর করেছে। তারা কৃষিঋণ ও রপ্তানি ঋণ ছাড়া বাকি সব ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশের উপরে রেখেছে। এর মধ্যে মেয়াদি ঋণ, চলতি মূলধন, বাণিজ্য ঋণ, গৃহঋণের সুদের হার সাড়ে ১০ থেকে ১১ শতাংশ রেখেছে। ভোক্তাঋণের ১৩ শতাংশ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদহার ২৪ শতাংশ রেখেছে।

প্রাইম ব্যাংক ৫ জুলাই থেকে নতুন সুদহার কার্যকর করেছে। তারা আমানতের সুদহার সর্বনিম্ন ২ থেকে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ করেছে। ঋণের মধ্যে কৃষি, মসলা, রপ্তানি খাতে সুদহার ৬ থেকে ৯ শতাংশ, যা আগের অবস্থানেই রয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর নির্বাহীদের সংগঠন এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ চলছে। ধীরে ধীরে কমে যাবে বলে তিনি মনে করেন।

এদিকে সুদের হার সামান্য হারে কমানো হলেও ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলো যেসব ফি, কমিশন বা চার্জ আরোপ করে রেখেছে, সেগুলো কমানোর ব্যাপারে কোনো কথা হচ্ছে না। এগুলোর কারণে ঋণের সুদের হার গড়ে ২ থেকে ৩ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে।

ব্যাংক ভেদে ঋণ নিতে গেলে ১ থেকে দেড় শতাংশ হারে ঋণ প্রসেসিং ফি দিতে হয়। এতে ১০ কোটি টাকা ঋণ নিলে প্রসেসিং ফি দিতে হয় ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। ব্যাংকিং খাতে সা¤প্রতিক সময়ে জালিয়াতির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো জামানত রেজিস্ট্রেশন করে নিচ্ছে। এর বিপরীতে কোনো কোনো ব্যাংক ১ শতাংশ ফি নিচ্ছে। আবার ঋণের বিপরীতে কোনো কোনো ব্যাংক সার্ভিসিং ফি নিচ্ছে ১ শতাংশ।

ক্ষুদ্র বা ভোক্তাঋণের বিপরীতে তদারকি এজেন্সি কমিশন নিচ্ছে ১ থেকে ২ শতাংশ। কোনো ঋণ আগাম পরিশোধ করে দিলে ক্লোজিং চার্জ নিচ্ছে ১ শতাংশ হারে। এ ছাড়া হিসাব খোলা, হিসাব পরিচালনা, কাগজপত্র তৈরি, গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ সবক্ষেত্রে ফি রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here