শ্যামল রায়ঃ সুদীপ কুমার নন্দী। একজন শেয়ার বাজার বিশ্লেষক এবং বিনিয়োগকারী। প্রায় ২ দশকেরও বেশী সময় ধরে শেয়ার বাজারের সাথে জড়িত। তার দৃষ্টিতে শেয়ার বাজারের অতিত বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলেছেন স্টক বাংলাদেশের সাথে।

স্টক বাংলাদেশঃ বর্তমান দিয়েই শুরু করা যাক। কেমন যাচ্ছে বাংলাদেশের শেয়ার মার্কেট? বিনিয়োগকারীরা কতটুকু আশাবাদী হতে পারেন?

সুদীপ কুমার নন্দীঃ আমার দৃষ্টিতে বর্তমানে বাংলাদেশের শেয়ার বাজার মোটামুটি ভালো। একটা সময় ছিলো মার্কেটে অনেক ধরনের গ্যাম্বলীং, মেনুপুলেশন এবং অস্বচ্ছতা লক্ষ্য করা যেত। এখন অবস্থা অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। বিনিয়োগকারীরাও সচেতন হয়েছে। তারা আর জেনে শুনে ফাঁদে পা দিচ্ছেন না। তবে আমার মনে হয় কারসাজির ধরনটা পরিবর্তন হয়েছে।

স্টক বাংলাদেশঃ এই মার্কেটকে কী কোনভাবে স্বাভাবিক মার্কেট বলা যায়? একটু ব্যাখ্যা করে বলবেন।

সুদীপ কুমার নন্দীঃ  অবশ্যই স্বাভাবিক বলতে পারি আমরা। কারণ শেয়ার বাজারের নিজস্ব একটা গতি প্রকৃতি আছে। আর সেটা নিশ্চয় সরল রেখার মত স্ট্রেট নয়। শেয়ার বাজারের ধর্মই হল ওটা নামা করে এগিয়ে যাওয়া। আবার পৃথীবির সব দেশের শেয়ার বাজার লক্ষ্য করলে একটা বিষয় দেখবেন। বিগ উত্থানের পর পতন নিশ্চিত। আমাদের দেশে পতন হয়ত ঘণ ঘণ হয়ে থাকে। তাই বলে উন্নত দেশের শেয়ার বাজারে যে, পতন হয় না তা কিন্তু নয়।

আমি মনে করি ২০১৪/২০১৫ সালের দিকে আমাদের শেয়ার বাজার অনেকটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। তার ধারাবাহিকতায় এখনও চলছে। আগে অবশ্য অনেকটা ভোলাটাইল ছিল বলা যায়। এখন বিনিয়োগকারীরা অনেকটা কনফিডেন্ট হতে পেরেছে বলে আমি মনে করি। আর যেটুকু কমেছে বা বাড়ছে এটাতো শেয়ার বাজারের স্বাভাবিক গতি প্রকৃতি। তা না হলে মানুষ মুনাফা করবে কিভাবে। বিনীগোকারীরাই বা আসবে কি জন্য শেয়ার মার্কেটে।

স্টক বাংলাদেশঃ অনেকেই বলছেন ৯৬ কিংবা ২০০০ সালের মত বাজারে আবারও একটি পতন আসছে। তার লক্ষণ শুরু হয়ে গেছে আপনার মতামত কি?

সুদীপ কুমার নন্দীঃ  আমার মনে হয়, এই ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীর কথাটাই বলতে হয়। তারা বিনিয়োগকারি নয় ফাঁটকা ব্যবসায়ী। যারা দু’চারদিন একটু বাজারে ডাউন ট্রেন্ড দেখলেই ধ্বস ধ্বস বলে চিৎকার করতে থাকে। এরকম অবস্থাটা সব সময়ই ছিলো। আসলে তারাতো জেনে শুনে বিনিয়োগ করে না। অন্যের কথায় বিনিয়োগ করে। মূলত তাদের কারণেই বাজারের সুনাম নষ্ট হয়ে যায়। আর এই সুযোগে এক শ্রেনীর লোক আছে যারা বাজার থেকে ফায়দা তুলে নেয়।

এমনিতেই আমাদের শেয়ার বাজারে ইমোশোনাল ব্যাপারটা কাজ করে তাতেই আবার উল্টা পালটা কথা শুনলে বিনিয়োগকারীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকে। স্বাভাবিকভাবে লেনদেনের পরিমান কমে যায়।

স্টক বাংলাদেশঃ কিন্তু গ্রাফ বা সূচক তো সে কথা বলছে না। বিনিয়োগকারীরা কোন দিকে যাবে তাহলে?

সুদীপ কুমার নন্দীঃ  এটাও একটা সমস্যা। অনেকেই গ্রাফ বা সূচক দেখে কেনা বেচা করে অর্থাৎ তুমি কিনলেই আমি কিনবো। এ রকমটা ভালো বাজারের লক্ষণ নয়। মানে বাজারে দেখবেন যখন সূচক বেড়ে যায় তখনই সবার কেনার ধুম পড়ে যায়। তার মানে আমরা বাই সেল করি অন্যের কেনা বেচার উপর নির্ভর করে।

কিন্তু আমাদের তো কেনা বেচা করা উচিত কোম্পানির মৌল ভিত্তি দেখে। বিনীয়োগকারীদের সুনির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্য বিনিয়োগ করা উচিত। লক্ষ্য করলে দেখবেন, বাজারে যখন কোন কোম্পানির দর হল্টেড হয়ে যায়। কেন হল্টেড হলো, কি কারনে দাম বাড়লো এটা বিবেচনা না করেই সবাই ঐ শেয়ারটি কিনতে মরিয়া হয়ে যায়। এর ফলে দেখবেন পরের দিনেই দাম আবার পড়তে থাকে। কিন্তু এটাতো হওয়ার কথা নয়।

স্টক বাংলাদেশঃ আমাদের মার্কেট কি ভালো কোম্পানী সংকটে ভূগছে? ভালো কোম্পানির জন্য  সরকারের কি করনীয় আছে বলে আপনি মনে করেন?

সুদীপ কুমার নন্দীঃ বাংলাদেশের ইকোনমি এবং শেয়ার বাজারের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় এক হাজার থেকে বারশ কোম্পানি অনায়াসে তালিকাভুক্ত হওয়া দরকার। আইন কানুন সংস্কারের মাধ্যমে কোম্পানি তালিকাভূক্তির পথটা সহজতর হয়েছে। তবে আরও সহজতরও হওয়া দরকার। এমন অবস্থা তৈরি করে দিতে হবে যাতে কোম্পানিগুলো নিজেরাই পুজিবাজারে আসতে উৎসাহ বোধ করে। আর এটা করা উচিৎ একটি স্টেবল মার্কেটের স্বার্থে।

স্টক বাংলাদেশঃ  আমাদের শেয়ার বাজার অনেকটাই ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্ভর হয়ে পড়েছে। এটার ভাল বা মন্দ কি? আর বিকল্প উপায়টাই বা কি?

সুদীপ কুমার নন্দীঃ  আমার দৃষ্টীতে একটা দেশে শক্তিশালী পুজিবাজারের জন্য এটা ভাল লক্ষণ না। আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধা নিয়ে এ কাজটা করছে ব্যাংকের কাজ অন্য। তারা কোন পুজিবাজারে খেলবে।  তাদের প্লে করার অন্য অনেক ক্ষেত্র আছে। পুজিবাজারে মূলতঃ প্রো-ডাকশন খাতের কোম্পানী ফুয়েল বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গুলোর জন্য উপযুক্ত। এজনই তো আমাদের পুজিবাজার মেরুদন্ড খাড়া করে দাড় হতে পারছে না। এজন্য পূজিবাজার কে আর্থিক এবং ব্যাংক খাতের প্রভাব মুক্ত হতে হবে।

স্টক বাংলাদেশঃ সম্প্রতি ১৭-১৮ অর্থ বছরের বাজেট ঘোষনা হয়েছে। বাজেটের পক্ষে বিপক্ষে অনেক কথা বার্তা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু আপনার দৃষ্টিতে এ বাজেট পূজিবাজার বান্ধব কতটুকু।

সুদীপ কুমার নন্দীঃ  সার্বিক বিবেচনায় এ বাজেট অত্যন্ত ভাল। একজন অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে মনে করি এই অর্থমন্ত্রীর বাংলাদেশ অনেক বড় স্বপ্ন দেখিয়েছে তার চেষ্টাতেই হয়ত বাংলাদেশের সাধারন মানুষের পার কেপিটা ইনকাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

আমরা এখন বড় বড় স্বপ্ন বাস্তবে রূপদান করতে সমর্থ হয়েছি কিন্তু আমার দৃষ্টিতে পুজিবাজারের জন্য বিন্দু-বিসর্গও পজেটিভ নাই এ বাজেটে। পুজিবাজার নিয়ে এ সরকারের অনেক বদনাম আছে। কিন্তু সেটা ঘোচানোর কোন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উদ্যোগটি নাই এ বাজেটে। পুজিবাজার কে বাদ দিয়ে অর্থনীতির ভিত্তি শক্ত করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। জানি না সরকার  কিংবা অর্থমন্ত্রী কেন এ বিষয়টা নিয়ে ভাবলেন না। যেটুকুও বারবার চেষ্টা করা হয়েছে অর্থমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সমালোচনায় সেটুকু কাজও বন্ধ হয়ে যাবে। এটা কোন ভাবেই পুজিবাজারের জন্য আনন্দ বার্তা নয়।

স্টক বাংলাদেশঃ স্টক বাংলাদেশকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

সুদীপ কুমার নন্দীঃ  ধন্যবাদ স্টক বাংলাদেশকেও সেই সাথে বিনিয়োগকারীদের বলছি আবেগ দিয়ে নয় ফান্ডামেন্টাল যাচাই করে বিনিয়োগ করুন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here