আজ পুঁজিবাজারে লভ্যাংশ ঘোষণার প্রভাব হতে পারে

0
758

বিশেষ প্রতিনিধি : লভ্যাংশ ঘোষণা বরাবরই পুঁজিবাজারে শেয়ারদরের ওঠানামাকে কমবেশি প্রভাবিত করলেও এবার তা ঘটছে না। সম্প্রতি দু-একটি বড় দরের শেয়ারে লভ্যাংশ ঘোষণার পর কিছুটা ইতিবাচক প্রবণতা চোখে পড়লেও অন্যান্য ক্ষেত্রে তা অনুপস্থিত। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভালো লভ্যাংশ ঘোষণার পরও মূল্যবৃদ্ধির বদলে কমতে দেখা গেছে অনেক শেয়ারের দর। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এখন বিনিয়োগকারীদের বড় অংশটির ডিভিডেন্ড পাওয়ার চেয়ে ক্যাপিটাল গেইনের দিকেই মনোযোগ বেশি। এর ফলে লভ্যাংশ ঘোষণার আগে কোম্পানিগুলোতে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি ঘটলেও পর তার কোনো প্রভাব থাকে না। তবে লভ্যাংশ ঘোষণার হার আগের বছরের চেয়ে কমে গেলে বা কোনো কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণায় ব্যর্থ হলে দ্রুতই তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যায়।
সাধারণত প্রতিটি নতুন বছরের প্রথম তিন মাস তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই লভ্যাংশ ঘোষণা করে থাকে। ঘোষণাকে সামনে রেখে বছরের অন্যান্য যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রথম কয়েক মাস ইতিবাচক প্রবণতার মধ্য দিয়ে যায় পুঁজিবাজারগুলো। এবারো বছরের শুরুতে তারই প্রতিফলন ছিল। জানুয়ারি মাসের প্রায় পুরোটাই বাজারগুলো কাটায় মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শুরু থেকেই বাজারগুলো মন্দার শিকার হতে শুরু করে যা অব্যাহত ছিল মাস শেষ হওয়া অবধি। অথচ এ মাসেই বেশির ভাগ কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। শুধুমাত্র গত সপ্তাহেই ১৩টি কোম্পানি লভ্যাংশ ঘোষণা সম্পন্ন করেছে। অথচ এদের মধ্যে দু-একটি বহুজাতিক কোম্পানি ছাড়া অন্যগুলো দর ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে বাজার এক ধরনের ইতিবাচক ফলও পাচ্ছে। স্টক লভ্যাংশ ঘোষণার রেকর্ড-পরবর্তী মূল্য সমন্বয়ে বাজারে যে হারে দরপতন ঘটে থাকে তা এবার ঘটছে না। তাই সূচকের বড় ধরনের অবনতি থেকেও বেঁচে যাবে বাজারগুলো।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান ও নির্দিষ্ট কিছু বিনিয়োগকারী যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে অভ্যস্ত তাদের বাদ দিলে এখন পুঁজিবাজারে লভ্যাংশের চেয়ে ক্যাপিটাল গেইনই গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। এতে করে কোম্পানির তথ্য জানাজানি হয়ে যাচ্ছে লভ্যাংশ ঘোষণার আগেই। ফলে ঘোষণার আগেই শেয়ারদরের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে যাচ্ছে। আর লভ্যাংশ ঘোষণার পর বেশির ভাগ কোম্পানি হচ্ছে দরপতনের শিকার।

এ বছর বাজার তুলনামূলকভাবে বেশি নেতিবাচক প্রবণতার শিকার হওয়ার কারণ হিসেবে তাদের অভিমত হচ্ছে, এবার বেশির ভাগ কোম্পানি নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করছে বেশি। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা সাধারণত নগদের চেয়ে স্টক লভ্যাংশকেই (বোনাস শেয়ার) প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। ফলে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া লভ্যাংশ ঘোষণার দিনই দর হারাচ্ছে কোম্পানিগুলো। অথচ একটি কোম্পানির নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা কোম্পানিটির আর্থিক অবস্থা ভালো হওয়ার লক্ষণ বলেই বিবেচনা করা হয় যেখানে বিনিয়োগ সবার জন্যই স্বস্তিদায়ক হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টোটা। আর এসব কিছুই বাজারের চলমান প্রবণতা স্বল্পমেয়াদি বিনিয়োগের ফল হিসেবে দেখছেন তারা যেখানে পুঁজিবৃদ্ধির প্রবণতাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। বাজার স্থিতিশীল না হওয়ার পেছনেও এটাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখেন তারা। এ মানসিকতার পরিবর্তন না হলে পুঁজিবাজার স্বাভাবিক হতে পারে না।এ দিকে বরাবরের মতো এবারো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই লভ্যাংশ ঘোষণার হার অন্যান্য কোম্পানিগুলো থেকে বেশি। এ পর্যন্ত ঘোষিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোই শীর্ষে। কোম্পানিটির লভ্যাংশের হার ৬২০ শতাংশ নগদ। গত সপ্তাহে কোম্পানিটি ৫২০ শতাংশ চূড়ান্ত লভ্যাংশ ঘোষণা করে। এর আগে মধ্যবর্তী লভ্যাংশ হিসেবে ১০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছিল কোম্পানিটি। আরেকটি বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি গ্লাক্সো স্মিথকিন ৩০০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে।

গত সপ্তাহে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ১৩ কোম্পিানির পরিচালনা পর্ষদ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৩ সমাপ্ত অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এসব কোম্পানির মধ্যে সিনো বাংলা ইন্ডাস্ট্রিজ ১০ শতাংশ নগদ, বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড ১৫ শতাংশ নগদ, রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্স ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ স্টক, গ্লাক্সো স্মিথকিন ৩০০ শতাংশ নগদ, আইডিএলসি ফাইন্যান্ড ৫ শতাংশ নগদ ও ২৫ শতাংশ স্টক, সিঙ্গার বিডি ১০০ শতাংশ নগদ ও ২৫ শতাংশ স্টক, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ৬২০ শতাংশ নগদ, ট্রাস্ট ব্যাংক ১২ শতাংশ স্টক, ইস্টার্ন ব্যাংক ২০ শতাংশ নগদ, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ১৩.৫০ শতাংশ স্টক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ২০ শতাংশ নগদ, ব্র্যাক ব্যাংক ১০ নগদ ও ১০ শতাংশ স্টক এবং পূবালী ব্যাংক ১০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।

কোম্পানিগুলোর মধ্যে আইডিএলসি ফিন্যান্স, সিঙ্গার বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানির উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে দেখা যায়নি। দুটোর ক্ষেত্রেই নগদ লভ্যাংশের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য হারে স্টক লভ্যাংশ ঘোষণাই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ভূমিকা রাখে। কিন্তু স্টক লভ্যাংশ বা বোনাস শেয়ার কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি পরবর্তী অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেললেও তা সচরাচর বিনিয়োগকারীদের নজর এড়িয়ে যায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here