স্টাফ রিপোর্টার : আগামীতে ব্যাংকাররা আরো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তবে এ চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশেই নয়, সারাবিশ্বের ব্যাংকারদের জন্যই। তাই এখনই সচেতন হতে হবে। নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকতে হবে। পাশাপাশি  দেশের সরকারি-বেসরকারি কোনো ব্যাংকেরই পরিচালক নিয়োগের কোনো নীতিমালা নেই। যে কোনো ব্যক্তিই পুঁজি বিনিয়োগ করে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক হয়ে যাচ্ছেন। এটিকে দেশের ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের অন্তরায় হিসেবে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সোমবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট  (বিআইবিএম) অডিটোরিয়ামে দুদিনব্যাপী আঞ্চলিক ব্যাংকিং সম্মেলনের সমাপনী দিনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

‘দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকিং খাতের মানব সম্পদ উন্নয়ন’ শীর্ষক দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং খাত সংস্কারবিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী।

এতে অতিথি ছিলেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী, সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এ চৌধুরী, ভারতের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (এনআইবিএম) পরিচালক ড. কে এল ধিঙ্গারা, নেপালের ন্যাশনাল ব্যাংকিং ইনস্টিটিউটের (এনবিআই) প্রধান নির্বাহী সানজিত সুব্বা, ভুটানের ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (এফআইটিআই) প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা পিনজোর জিলিটসন, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলনের কান্ট্রি ম্যানেজার ভারুনা প্রিয়শান্তা কোলামুন্না দ্বিতীয় অধিবেশনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

সম্মেলনের সমাপনী সেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এবং বিআইবিএমের এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান। সেশনের চেয়ার হিসেবে ছিলেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের সর্বনিম্ন হার এ মহূর্তে নেপালের। দেশটির ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ১ দশমিক ৭১ শতাংশ। বিআইবিএমের সম্মেলনের সমাপনী দিনের বড় অংশজুড়ে আলোচনা ছিল খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নেপালের কৌশল নিয়ে।

সম্মেলনে নেপাল সানিমা ব্যাংকের সিইও ভুবন কুমার দাহাল জানান, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ করতে সরকার ও নেপাল কেন্দ্রীয় ব্যাংক যৌথভাবে কাজ করছে। ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের পাসপোর্ট জব্দ করার পাশাপাশি দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে গ্রাহকরা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করছে।

তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য পরিচালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রত্যেকটি ব্যাংকের নিট মুনফার ৩ শতাংশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য ব্যয় করা হচ্ছে।

সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা এস কে সুর চৌধুরী। তার কাছে, প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশে ব্যাংক পরিচালকদের প্রশিক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, পরিচালকদের প্রশিক্ষণের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনাধীন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিআইবিএম এগিয়ে আসতে পারে।

সম্মেলনের শেষ দিনের প্রথম সেশনে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)  ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মাদ এ (রুমী) আলী। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের চেয়েও আগামীতে ব্যাংকাররা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তবে এই চ্যালেঞ্জ শুধু বাংলাদেশেই নয়। সারাবিশ্বের ব্যাংকারদের জন্যই আগামীতে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।

ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক মঈনুদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ। ভারতে সাধারণ খেলাপি থেকে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের পৃথক করা হয়ে তাকে। আমাদের দেশের ইচ্ছাকৃত খেলাপিদেরও পৃথক করা উচিত।

ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরফান আলী বলেন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছাতে প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই। বিআইবিএমের সুপার নিউমারারি অধ্যাপক এবং পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেলাল আহমেদ  চৌধুরী বলেন, আগামীতে ব্যাংকের ঝুঁকি সংক্রান্ত যে সব চ্যালেঞ্জ আসবে তা মোকাবেলায় পরিচালনা পরিষদকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব বিধি বিধান রয়েছে তা সঠিকভাবে মেনে চললে ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসবে।

আগামী দিনে যে ঝুঁকি তৈরি হবে এই ঝুঁকি মোকাবেলায় ব্যাংকে যোগ্যতাসম্পন্ন পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংককে পরিচালকদের একটা ফিট লিস্ট তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বোর্ডকে নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে। বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, পরিচালকদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হলে সরকারের উদ্যোগ প্রয়োজন।

সম্মেলনে অন্যান্য বক্তারা বলেন,  নেপালে ঋণ খেলাপিদের কোনোভাবেই ছাড় দেয়া হয় না। তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা হয় এবং তাদের পাসপোর্ট জব্দ করা হয়। এর ফলে দেশটিতে খেলাপি ঋণের হার একেবারেই শূন্যের কোঠায়। আমাদের স্বপ্নটা তারা বাস্তবায়ন করেছে। নিয়ন্ত্রণহীন খেলাপি ঋণ, হ্যাকিং, নতুন প্রযুক্তির আগমন, তারল্য সংকট, অদক্ষ মানবসম্পদ, পরিচালনা পর্ষদের অদক্ষতা, বাছ-বিচারহীন ঋণ প্রদান, প্রশিক্ষণের অভাব এবং ব্যাঙের ছাতার মতো ব্যাংকের প্রসারের কারণে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংককে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে একটি রোড ম্যাপের আলোকে উত্তরণের ছক তৈরি করতে হবে বলে মনে করেন তারা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here