সিনিয়র রিপোর্টার : দেশের পুঁজিবাজারে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। সর্বশেষ প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থার মোট বিনিয়োগ প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা।

বিশাল আকারের পোর্টফোলিওতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রায় সব কোম্পানিরই শেয়ার রয়েছে। এতে মৌল ভিত্তির কোম্পানির পাশাপাশি দুর্বল আর্থিক ভিত্তির অনেক কোম্পানির শেয়ারও ঠাঁই পেয়েছে। আছে ওভার দ্য কাউন্টারভুক্ত (ওটিসি) ১৮ কোম্পানির শেয়ার।

সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুুযায়ী, আইসিবির পোর্টফোলিওতে থাকা শেয়ার ও ফান্ড সংখ্যা ৩৫৪টি। এর মধ্যে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত নয়, এমন ৪৪ কোম্পানির শেয়ারও রয়েছে। পোর্টফোলিওতে থাকা সব শেয়ারের মধ্যে ১১৯টির বাজারমূল্য ক্রয়মূল্যের তুলনায় বেশি। অর্থাৎ এগুলোতে মুনাফা রয়েছে। এর মধ্যে আবার ১৮টি ওভার দ্য কাউন্টার বাজারভুক্ত। বাকি ২৩৫ কোম্পানির শেয়ারের বাজারমূল্য কেনা দামের তুলনায় কম। অর্থাৎ, পোর্টফোলিওতে থাকা দুই-তৃতীয়াংশ শেয়ারেই লোকসান রয়েছে।

দেশের পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড সংখ্যা বর্তমানে ৩৩০টি।

দেশের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিনিয়োগ বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশের বেশিরভাগ প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগে পেশাদারি আচরণ দেখায় না। মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও সব শেয়ারে বিনিয়োগ করে। সরকারি মালিকানার ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও একই চিত্র। আইসিবি তার ব্যতিক্রম নয়।

আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ইফতেখার-উজ-জামান বলেন, পোর্টফোলিওতে এত বেশি শেয়ার থাকা নিয়ে কেউ সমালোচনা করতেই পারে। তবে আইসিবির ক্ষেত্রে বিশেষটা ভিন্নভাবে দেখতে হবে। কারণ, প্রতিষ্ঠানটি শুধু মুনাফার জন্য পরিচালিত হয় না।

শেয়ারবাজারকে স্থিতিশীল রাখা ও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বও পালন করছে। মুনাফার বিবেচনায় ভালো না হলেও বাজারের সার্বিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখার স্বার্থে অনেক শেয়ার রাখতে হচ্ছে। তবে এর মধ্যে খারাপ শেয়ারের সংখ্যা খুবই কম। ধীরে ধীরে তা কমিয়ে আনা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইসিবির প্রধান কার্যালয়ের পোর্টফোলিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এতে তালিকাভুক্ত ২০ খাতের শেয়ার রয়েছে। এর মধ্যে আটটিতে মুনাফা রয়েছে। বাকি ১২টিতে লোকসান। ব্যাংক খাতে আইসিবির মোট বিনিয়োগ ছিল ৭৪৮ কোটি টাকা। বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরির সময় এর বাজারমূল্য ছিল ৬২৮ কোটি টাকা। এ ক্ষেত্রে লোকসান ছিল ১২০ কোটি টাকা বা ১৬ শতাংশ।

প্রকৌশল খাতের ২৫ কোম্পানিতে আইসিবির ক্রয়মূল্যে বিনিয়োগ ছিল ৩৩০ কোটি টাকা, যার বাজারমূল্য কমে দাঁড়িয়েছিল ২৯৫ কোটি টাকা ও লোকসান ছিল পৌনে ১১ শতাংশ। বীমা খাতের ১৮৯ কোটি টাকার বিনিয়োগ করা শেয়ারের মূল্য কমে দাঁড়ায় ১১৯ কোটি টাকা ও লোকসান ছিল ৩৭ শতাংশ। একইভাবে সিরামিক খাতে ১১ শতাংশ, মিউচুয়াল ফান্ড খাতে ৪৭, বিবিধ খাতে ৪৩, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতে সাড়ে ২১, ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের প্রায় ৩৪ শতাংশ লোকসান ছিল উল্লেখযোগ্য।

অন্যতম প্রধান মার্চেন্ট ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের এমডি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, শেয়ারবাজারকে আজকের অবস্থানে আসতে যে ক’টি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা রয়েছে, তার মধ্যে আইসিবির ভূমিকাই সর্বাধিক। তবে এক সময়ের ‘মুরবি্ব’র ভূমিকায় থাকা এ প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ আচরণ এখন আর অনুকরণীয় নয়। তার মতে, প্রতিষ্ঠানটির পোর্টফোলিও দেখে যে কেউ এর পেশাদারিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। এখানে লোকসানি কোম্পানির শেয়ার ও ওটিসিভুক্ত কোম্পানির শেয়ার থাকা ভালো দেখায় না।

তিনি বলেন, একজন বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক খুব ভালো কোম্পানির শেয়ার যখন অতি মূল্যায়িত থাকে, তখন তা কেনেন না। আবার খারাপ কোম্পানির শেয়ার যত নিচেই নামুক না কেন, তাও কেনেন না। আইসিবির বিনিয়োগ এমনটাই হওয়া উচিৎ।

অর্থনীতি ও শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ অবশ্য মনে করেন, শেয়ারবাজারের স্বার্থে আইসিবি যদি সব শেয়ার ধারণ করতে চায়, তা করতে কোনো বাধা নেই। তবে নিজেও একটি তালিকাভুক্ত কোম্পানি হওয়ায় মুনাফার বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। খারাপ বিনিয়োগ প্রত্যাহার না করে আইসিবি ঠিক করছে না বলেও মনে করেন তিনি। আইসিবিকে মনে রাখা উচিত তার বিনিয়োগ পোর্টফোলিও অনেকে অনুসরণ করেন। তাই বিনিয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

আইসিবির এমডি বলেন, আইসিবির বিনিয়োগ কার্যক্রম আগের তুলনায় এখন অনেক গবেষণানির্ভর। তিনি জানান, এখন স্টক অ্যানালাইসিস ও শেয়ার রিসার্স বিভাগের পরামর্শ নিয়ে পোর্টফোলিও ম্যানেজমেন্ট বিভাগ শেয়ার কেনাবেচা করে।

NO COMMENTS