আইপিও এবং অশুভ চক্র

0
3277

মোহাম্মদ মুসা : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তারিখে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম খায়রুল হোসেইন স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনা সংস্থাটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। নির্দেশনাটি বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আইপিওর নির্দেশিত মূল্য আবিষ্কারের ক্ষেত্রে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের আচরণবিধিসংক্রান্ত। বিএসইসি (পাবলিক ইস্যু) রুলস, ২০১৫ অনুসারে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা হলো:

(১) মার্চেন্ট ব্যাংকারস ও পোর্টফোলিও ম্যানেজার, (২) কমিশন কর্তৃক অনুমোদনপ্রাপ্ত বৈদেশিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী (২) স্বীকৃত পেনশন ও প্রভিডেন্ড ফান্ড; (৩) ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান; (৪) ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, (৪) কমিশন অনুমোদিত প্রাতিষ্ঠানিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল; (৫) অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি, (৬) মিউচুয়াল ফান্ডস, (৬) স্টক ডিলার।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের দুই ধরনের ভূমিকা আছে। প্রথমত. তারা আইপিওর মূল্য আবিষ্কারে অংশগ্রহণ করতে পারে। আইপিওর মূল্য আবিষ্কারের জন্য ইস্যুয়ার আইপিওতে আনা শেয়ারের প্রসপেক্টাস ও শেয়ারসংশ্লিষ্ট সব তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করবে এবং যোগ্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে শেয়ারটির মূল্য কত হবে, তা জানানোর জন্য অনুরোধ করবে।

কমপক্ষে তিন ধরনের পাঁচটি যোগ্য বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে দাম সংগ্রহ করার পর ইস্যুয়ার শেয়ারটির নির্দেশিত মূল্যনির্ধারণ করবে। ইস্যুয়ার, তার ইস্যু ম্যানেজার ও সংশ্লিষ্ট যোগ্য বিনিয়োগকারীরা নির্দেশিত মূল্যটি প্রসপেক্টাসে লিপিবদ্ধ করবে এবং প্রসপেক্টাসটি বিএসইসিতে জমা দেবে। এ নির্দেশিত মূল্যের ওপর ভিত্তি করে আইপিওর বিধিবদ্ধ মূল্যনির্ধারণের উপরের সীমা (নির্দেশিত মূল্যের ২০ শতাংশ উপরে) ও নিচের সীমা (নির্দেশিত মূল্যের ২০ শতাংশ নিচে) নির্ধারণ করবে।

দ্বিতীয়ত. বিএসইসি নির্দেশিত মূল্যের সম্মতি দেয়ার পর যোগ্য বিনিয়োগকারীরা তাদের জন্য নির্ধারিত কোটার বিপরীতে বিনিয়োগ করার জন্য আবেদন করবে। কোটায় নির্ধারিত পরিমাণের বেশি শেয়ার কেনার আবেদন পড়লে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের আবেদনে উল্লেখিত পরিমাণ অনুপাতে শেয়ার প্রদান করবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের দেয়া শেয়ারের দাম হবে তাদের আবেদনে উল্লেখ করা দামের ওয়েটেডে গড় দামের সমান।

বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ার অপব্যবহার হচ্ছে— এমন অভিযোগ অনেকের। অভিযোগের সত্যতা বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আনা শেয়ারের ইস্যুমূল্যের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। প্রায় প্রতিক্ষেত্রেই দেখা যায়, ইস্যুমূল্য ন্যায্যমূল্যের চেয়ে অনেক উপরে ধার্য করা হয়েছে। সে কারণে বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ায় আনা শেয়ারগুলোর দাম প্রথম দিকে ইস্যুমূল্যের চেয়ে অনেক বেশি থাকলেও কিছুদিন না যেতেই শেয়ারগুলোর দাম ইস্যুমূল্যের অনেক নিচে চলে যায়।

অভিযোগ আছে, শেয়ারগুলোর দাম প্রথম দিকে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখা হয়, যাতে বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা তাদের কোটার বিপরীতে যে শেয়ারগুলো কিনেছেন, তা বিক্রি করার সুযোগ পান। শেয়ারের মূল্য কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে রাখার জন্য যে মূল্য সাহায্য প্রথমদিকে দেয়া হয়েছিল, তা উঠিয়ে নেয়ামাত্র শেয়ারের মূল্য তার ন্যায্য দামের চেয়ে নেমে আসে, যা কিনা ইস্যু মূল্যের অনেক নিচে।

মোহাম্মদ মুসা

বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়া একটি চক্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বলে অনেকে বলে থাকেন। এর পেছনে যথেষ্ট যুক্তি আছে। তাদের মতে ইস্যুয়ার, ইস্যু ম্যানেজার, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে আনা শেয়ারে বিনিয়োগ করার যোগ্য বিনিয়োগকারী একটি অংশ এক অশুভ চক্রের জন্ম দেয়। ইস্যুয়ার ও ইস্যু ম্যানেজার বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর একটি অংশকে গণপ্রস্তাবে আসা শেয়ারের দাম বেশি দেখিয়ে বিএসইসিতে জমা দেয়ার জন্য প্রভাবিত করে।

বিনিময়ে তাদের দেয়া শেয়ার স্টক এক্সচেঞ্জে বেচাকেনার শুরুতে একটি নির্দিষ্ট মুনাফায় বিক্রির ব্যবস্থা করে দেয়ার অঙ্গীকার করা হয়। এর মাধ্যমে অশুভ চক্রের প্রতিটি অংশই লাভবান হয়। ইস্যু ম্যানেজার তাদের শেয়ার ন্যায্য দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে বেশি টাকা উত্তোলন করতে পারে আর যোগ্য বিনিয়োগকারীরা তাদের শেয়ার বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে লাভবান হন। ক্ষতিগ্রস্ত হন বেচারা সাধারণ ব্যক্তিবিনিয়োগকারী, যারা তাদের অজ্ঞতার কারণে কৃত্রিমভাবে বাড়ানো অতিমূল্যায়িত শেয়ার কিনে থাকেন।

বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ার শুরু থেকে এ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা বিএসইসির ছিল। কিন্তু এ কাজে তারা যে সফল হয়নি, তার প্রমাণ সর্বশেষ বিএসইসির এ নির্দেশনাটি। এবার আসা যাক নির্দেশনাটিতে কী বলা হয়েছে। এ নির্দেশনাটিতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বুক বিল্ডিংয়ে আসা কোনো শেয়ারের দাম প্রস্তাব করার আগে শেয়ারটি ও তার ইস্যুয়ারের কারিগরি, আর্থিক, ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক ও মালিকানা সংক্রাংন্ত সব বিষয় বিবেচনায় আনতে বলা হয়েছে। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বিডিং রিকমেনডেশন কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। এ কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা আছে, এমন কমপক্ষে দুজনকে রাখতে হবে।

এ কমিটি সিকিউরিটিজের মূল্যমান ও প্রস্তাবনা সবিস্তারে বিশ্লেষণ করে যোগ্য বিনিয়োগকারীকে ইলেকট্রনিক বিডিংয়ে অংশগ্রহণ, বিডিংয়ের পরিমাণ ও মূল্যের ব্যাপারে সুপারিশ করবে। এ কমিটির সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে যোগ্য বিনিয়োগকারী বিডিংয়ে অংশগ্রহণ করবে কিনা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীকে তাদের সিদ্ধান্ত ও কমিটির সুপারিশসংক্রান্ত কার্যবিবরণী কমিশনের পরীক্ষণের জন্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, যোগ্য বিনিয়োগকারী ও সুপারিশ কমিটি যথাযথ শ্রম ও নিরপেক্ষ পেশাধারী বিচার নিশ্চিত করবে এবং বিডিংয়ে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখবে। বিশ্লেষণে তারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সিকিউরিটিজ মূল্যমান নির্ধারণী পদ্ধতি ব্যবহার করবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীরা বিডিং প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার দুদিনের মধ্যে সব হিসাবসহ তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন বিএসইসিতে জমা দিতে বাধ্য হবে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতির প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের মাধ্যমে আনা শেয়ার নীতিতে একটি ভালো পরিবর্তন আনা হয়েছে। বিএসইসিকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। এতদিন যোগ্য বিনিয়োগকারীদের শেয়ার মূল্যায়নে কোনো জবাবদিহিতা ছিল না। শেয়ারের যে দামই তারা প্রস্তাব দিত, সে দামই বিএসইসিকে ধর্তব্যের মধ্যে নিতে হতো। এতে করে অল্প কয়েকজন এলিজিবল ইনভেস্টরের দেয়া বেশি দাম গড় দামকে অনেক বাড়িয়ে দিত এবং বিএসইসিকে আইপিওর দাম অনেক বেশি নির্ধারণে বাধ্য করত।

নতুন নির্দেশনা বাস্তবায়নের কারণে এখন থেকে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা তাদের ইচ্ছামতো দাম প্রস্তাবের আগে অনেকবার চিন্তা করবেন। কারণ তাদের প্রস্তাবিত দাম যে যথার্থ, তার তথ্যভিত্তিক প্রমাণ দিতে হবে। যোগ্য বিনিয়োগকারীকে আইপিওর মূল্যায়নে একটি সুপারিশ কমিটির সুপারিশের ওপর নির্ভর করতে হবে। সুপারিশ কমিটি সিকিউরিটিজের এবং সিকিউরিটিজের ইস্যুয়ার সংশ্লিষ্ট সব তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণপূর্বক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে সিকিউরিটিজে দামের সুপারিশ করবে।

যেহেতু সুপারিশ কমিটিতে কমপক্ষে দুজন যথাযথ জ্ঞানসম্পন্ন, শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন, দক্ষ ও অভিজ্ঞ সদস্য থাকবেন, তাই আশা করা যায় সুপারিশকৃত দামের যথার্থতা থাকবে। সর্বশেষ যে চেকটি আছে, তা হলো বিএসইসি। যোগ্য বিনিয়োগকারীদের বিএসইসিতে যেসব তথ্য-উপাত্ত ও যে পদ্ধতি ব্যবহার করে দাম নির্ধারণ হয়েছে, তা সহ একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। বিএসইসির পক্ষে যোগ্য বিনিয়োগকারীদের প্রস্তাবিত দাম তথ্যভিত্তিক হয়েছে কিনা, দাম নির্ধারণে যথাযথ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে কিনা ও হিসাব ঠিকমতো করা হয়েছে কিনা তা নিরূপণ করা সহজ হবে। যদি কোনো যোগ্য বিনিয়োগকারী যথাযথভাবে দাম নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, তার কাছে বিএসইসি কৈফিয়ত চাইতে পারবে। এ কারণে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা আইপিওর দাম নির্ধারণে যথেষ্ট সতর্ক থাকবেন।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা উল্লেখযোগ্য হলেও এবং এ পরিবর্তনের ফলে অনেক বড় রকমের অতিমূল্যায়িত আইপিও থেকে আমরা অব্যাহতি পেলেও এ পদ্ধতির অপব্যবহার পুরাপুরি রদ করা যাবে না। কারণ একই ভ্যালুয়েশন টেকনিক ব্যবহার করা হলে একই সিকিউরিটিজের মূল্যমান ভিন্ন হতে পারে, যদি টেকনিকে ব্যবহূত প্যারামিটারগুলোর অনুমিতি ভিন্ন হয়। একটি উদাহরণ দেয়া যাক।

ডিভিডেন্ড ডিসকাউন্টিং মডেলের একটি বহুল ব্যবহূত মডেল হলো স্থির প্রবৃদ্ধি মডেল। এ মডেল দ্বারা একটি কোম্পানির শেয়ারের ন্যায্যমূল্য বের করতে আগামী বছরের কাঙ্ক্ষিত লভ্যাংশ, লভ্যাংশের স্থির প্রবৃদ্ধির হার ও শেয়ারটির কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন ব্যবহার করা হয়। আগামী বছরের কাঙ্ক্ষিত লভ্যাংশকে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন ও লভ্যাংশের স্থির প্রবৃদ্ধির হারের পার্থক্য দিয়ে ভাগ করলে যা পাওয়া যাবে, তা-ই শেয়ারটি আজকের ন্যায্যমূল্য।

ধরা যাক, একটি কোম্পানি অতি সম্প্রতি এর শেয়ারপ্রতি ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে ১ টাকা, কোম্পানিটির ডিভিডেন্ডের প্রবৃদ্ধির হার অনুমান করা হয়েছে বছরে ১০ শতাংশ আর কোম্পানিটি শেয়ার থেকে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন হলো ১৫ শতাংশ। এ অনুমানগুলোর ওপর ভিত্তি করে হিসাব করলে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের ন্যায্য দাম হবে ২২ টাকা। এখন যদি অন্য অনুমানগুলো ঠিক রেখে শুধু ডিভিডেন্ডের প্রবৃদ্ধির হার অনুমান করা হয় ১১ শতাংশ, তাহলে কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের ন্যায্য দাম হবে ২৭ দশমিক ৭৫ টাকা। অন্য কোনো মডেল ব্যবহার করলে শেয়ারটির ন্যায্য দাম ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে বিএসইসি অন্য ধরনের সমস্যায় পড়বে বলেই আমার ধারণা।

লেখকঅধ্যাপক : ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here