আইপিও অনুমোদনে বিরতি, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির প্রস্তুতি

0
6922
সিনিয়র রিপোর্টার : পাবলিক ইস্যু বিধিমালা সংশোধনের কারণে ২৮ কোম্পানিকে নতুন করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন করতে হবে। সংশোধনী বিধিমালার শর্ত পূরণ করে আইপিও আবেদনের বাধ্যবাধকতায় নতুন আইপিও আসার ক্ষেত্রে কিছুটা ধীরগতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে করে আগামী কয়েক মাস আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকতে পারে। ইস্যু ব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
বিরতির মধ্যে জ্বালানী খাতের রাষট্রায়ত্ত কিছু কোম্পানির তালিকাভুক্তির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। লম্বা বিরতির মুহূর্তে পুঁজিবাজার থেকে টাকা উত্তোলনের জন্য তালিকাভুক্তিক অনেক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যে কারণে বিএসইসিতে জানুয়ারির ১০ তারিখ পর্যন্ত নতুন করে আইপিও আবেদনের পরামর্শ দেয়া হলেও মঙ্গলবার পর্যন্ত কোনো আবেদন জমা পড়েনি।

গত ৩১ ডিসেম্বর পাবলিক ইস্যু বিধিমালা সংশোধনের পর সম্প্রতি শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) পক্ষ থেকে ২৮ কোম্পানিকে নতুন করে আইপিওর আবেদন করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে যেসব কোম্পানি প্রিমিয়াম চেয়েছে, তাদের বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আবেদন করতে বলা হয়েছে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আবেদন করার নতুন যোগ্যতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়ার কথা বলা হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। অন্যদিকে অভিহিত মূল্যে শেয়ার বিক্রিতে আগ্রহী কোম্পানি ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে আবেদন করতে পারবে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই সংশোধিত বিধিমালার সংযোজিত শর্ত পূরণ করে আইপিও আবেদন জানাতে হবে।

জানা গেছে, সংশোধিত বিধির শর্ত পূরণ করে স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে আইপিও আবেদন করতে গড়ে ইস্যুয়ার কোম্পানিগুলো জন্য প্রায় তিন মাস সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। আর বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে আরো কিছুটা সময় প্রয়োজন হতে পারে।

অবশ্য কমিশন সূত্র জানিয়েছে, স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে আবেদন করা কয়েকটি কোম্পানির আইপিও যাচাই-বাছাই প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। এখন সেসব কোম্পানি সংশোধিত বিধিমালার আলোকে নতুন করে আবেদন জমা দিলে তা দ্রুত অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হতে পারে।

এ বিষয়ে এএফসি ক্যাপিটালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুব এইচ মজুমদার বলেন, পাবলিক ইস্যু বিধিমালা সংশোধনীর কারণে নতুন করে আইপিওর আবেদন করতে হবে। এতে বাজারে নতুন ইস্যু আসার প্রবাহে একটি বিরতি পড়তে পারে। তবে আগামী দু-তিন মাসের মধ্যে প্রিমিয়ামে আসা কোম্পানিগুলো নতুন করে আবেদনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে পারবে।

সাময়িক এ শূন্যতা পূরণে নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে বাজারে আসতে চাওয়া কোম্পানিগুলোর আবেদন বিবেচনা করতে পারে। এছাড়া বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে একটি ধাপ কমিয়ে আনার ফলে এ প্রক্রিয়ায় এখন সময় কিছুটা কম লাগবে।

সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, স্থিরমূল্য পদ্ধতিতে আবেদনের ক্ষেত্রে কোম্পানি বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে অর্থ সংগ্রহের আবেদন জানাবে। এ আবেদনপত্রের সঙ্গে রেড হেরিং প্রসপেক্টাস ও নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। সে প্রসপেক্টাস কোম্পানি, ইস্যু ম্যানেজার প্রতিষ্ঠান, বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।

আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে আবেদনের পর পরই ওয়েবসাইটে প্রসপেক্টাস প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা তা পর্যালোচনা করতে পারেন। কোম্পানি চাইলে প্রসপেক্টাস হালনাগাদও করতে পারবে।

আবেদনপত্র পাওয়ার ২০ দিনের মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষ করে প্রাথমিক সুপারিশ দিতে হবে স্টক এক্সচেঞ্জকে। এর পর কমিশন কোম্পানির আবেদন, প্রসপেক্টাস ও স্টক এক্সচেঞ্জের প্রাথমিক সুপারিশ যাচাই করবে। কমিশন নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে কোম্পানির পরিচালক, ইস্যু ব্যবস্থাপক, নিরীক্ষক ও সম্পদ মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে অধিকতর তথ্য, দলিলাদি, ব্যাখ্যা চাইতে পারে।

অতিরিক্ত তথ্য, ব্যাখ্যা পাওয়ার পর সাতদিনের মধ্যে তালিকাভুক্তি বিধি অনুসরণ করে স্টক এক্সচেঞ্জকে কমিশনের কাছে চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দিতে হবে। এর পর কমিশন সব তথ্য ও স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ বিবেচনা করে কোম্পানির আইপিও আবেদনে সম্মতি কিংবা বাতিল করতে পারবে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইস্যুয়ার কোম্পানি ও ইস্যু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান তত্পর হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে প্রায় তিন মাস সময় প্রয়োজন হবে। আর বুক বিল্ডিং পদ্ধতির ক্ষেত্রে আরেকটু বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে। যদিও সংশোধিত বিধিমালায় একটি ধাপ কমিয়ে আনায় বুক বিল্ডিং প্রক্রিয়ার সময় আগের চেয়ে কিছুটা কম লাগবে।

স্থিরমূল্য পদ্ধতির অধিকাংশ শর্ত পূরণের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের নিলাম ও কাট অফ প্রাইস নির্ধারণের কারণে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কিছুটা সময় বেশি প্রয়োজন হবে। সংশোধিত বিধিমালায় বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসা কোম্পানির শেয়ারের নির্দেশক মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। এতে এ প্রক্রিয়ার একটি ধাপ কমে যাওয়ায় সময় সাশ্রয় হবে।

এ পদ্ধতিতে প্রিমিয়ামে আসা আইপিওর জন্য কোম্পানি প্রথমে রোড শোর আয়োজন করবে। এক্ষেত্রে সর্বশেষ তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব বিবরণী ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কোম্পানির ভ্যালুয়েশন রিপোর্টসহ কোম্পানির সব তথ্য খসড়া প্রসপেক্টাস আকারে বিনিয়োগকারীদের কাছে উপস্থাপন করতে হবে।

রোড শোর তিন কার্যদিবসের মধ্যে যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সংশ্লিষ্ট কোম্পানি সম্পর্কে মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণ জানাতে পারবেন। তাদের এ মন্তব্য ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে ইস্যুয়ার কোম্পানি অথবা ইস্যু ম্যানেজার খসড়া প্রসপেক্টাস বা রেড হেরিং প্রসপেক্টাস চূড়ান্ত করে আইপিও-সংক্রান্ত অন্য সব তথ্যের সঙ্গে তা বিএসইসি ও স্টক এক্সচেঞ্জে দাখিল করবে। এসব তথ্য ও স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশ পর্যালোচনার পর কমিশন সন্তুষ্ট হলে কাট অফ প্রাইস নির্ধারণের জন্য বিডিং বা নিলামের অনুমোদন দেবে।

এর পর নিলামের তথ্য, কাট অফ প্রাইস, শেয়ার বরাদ্দ পাওয়া যোগ্য বিনিয়োগকারীদের তালিকা এবং আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বরাদ্দকৃত শেয়ার সংখ্যা ও দর ইত্যাদি তথ্যসহ প্রসপেক্টাস চূড়ান্ত করে বিএসইসির কাছে জমা দিতে হবে। এটি নিলাম শেষ হওয়ার পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে জমা দিতে হবে। এর পর কমিশন যাচাই-বাছাই শেষে আইপিওর অনুমোদন দিতে পারে।

এ বিষয়ে বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান বলেন, আইপিও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতেই বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। এখন সংশোধিত বিধিমালার শর্ত পূরণ করে নতুন করে আবেদনের বাধ্যবাধকতায় বাজারে নতুন শেয়ারের প্রবাহে সাময়িক ধীরগতি দেখা দিতে পারে। তবে বিষয়টি অনেকাংশেই ইস্যুয়ার কোম্পানি ও ইস্যু ব্যবস্থাপকের তত্পরতার ওপর নির্ভর করবে। তারা যদি দ্রুত শর্ত পূরণ করে আবেদন জানাতে পারে, তাহলে দাখিলকৃত তথ্যাদি যাচাই-বাছাই ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কমিশনও তা অনুমোদন দিতে পারবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here