আইপিওর অর্থ ব্যবহারে কঠোর নীতিমালা করবে বিএসইসি

0
713
এসবি ডেস্ক : শেয়ারবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ বিভিন্ন কোম্পানি অনুৎপাদনশীল খাতের জন্য নেয়া ব্যাংকঋণ পরিশোধে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাই আইপিওর মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ ও তার ব্যবহার পদ্ধতির ক্ষেত্রে আরো কঠোর হতে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) শিগগিরই এ-সংক্রান্ত নীতিমালা তৈরি করতে যাচ্ছে। বিএসইসির নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশই কোম্পানিগুলো ব্যবহার করছে ব্যাংকঋণ পরিশোধে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রেই ওই সব কোম্পানি ঋণের অর্থসংশ্লিষ্ট শিল্পে বিনিয়োগ না করে অন্যত্র খরচ করে। লাভজনক প্রকল্পে বিনিয়োগ না করায় কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি পায়নি। এছাড়া আইপিও অর্থের ব্যবহারের ক্ষেত্র পরিবর্তন ছাড়াও এ ব্যাপারে কোম্পানিগুলো স্বেচ্ছাচারিতা করে থাকে, যা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
গত বছর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়, আইপিওর অর্থ দিয়ে ব্যাংকঋণ পরিশোধের পরও কোম্পানিগুলোর আয় বাড়েনি বরং কমেছে। এ অবস্থায় আইপিওর অর্থ ব্যবহারে একটি নীতিমালা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছিল স্টক এক্সচেঞ্জটির পক্ষ থেকে। পাশাপাশি শুধু ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য আইপিও অনুমোদন না দেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। এ অবস্থায় আইপিওর অর্থ ব্যবহারে নতুন নীতিমালা প্রস্তুত করতে যাচ্ছে কমিশন। ওই নীতিমালায় শিল্পে বিনিয়োগ ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ঋণ গ্রহণ করা হলে ওই ঋণ পরিশোধের জন্য শেয়ারবাজার থেকে মূলধন উত্তোলনে অনুমতি পেতে কঠোর শর্তারোপ করা হবে কোম্পানিগুলোকে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
ডিএসইর এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৯ কোম্পানি আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে মূলধন উত্তোলন করে। এর মধ্যে ১৭টি কোম্পানিরই মূলধন উত্তোলনের উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকঋণ পরিশোধ করা। আইপিও প্রক্রিয়ায় শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্তির পরবর্তী বছরে এসব কোম্পানির মুনাফা বাড়েনি বরং কমেছে।
এ কারণে কেবল ব্যাংকঋণ পরিশোধে আইপিও অনুমোদন না দেয়ার জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে সুপারিশ জমা দিয়েছিল ডিএসই। ওই সুপারিশে ডিএসইর পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো কোম্পানিকে আইপিও প্রক্রিয়ায় উত্তোলিত মূলধনের ৩০ শতাংশের বেশি অর্থ ঋণ পরিশোধে ব্যবহার করতে দেয়া ঠিক হবে না। এ নীতি অনুসরণ করা না হলে খেলাপি ঋণগ্রহীতারা তাদের কোম্পানির শেয়ার বিক্রি করে নিজেদের দায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ওপর চাপাবে।
কমিশনের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ব্যাংকঋণ পরিশোধে আইপিও অনুমোদন করা নিয়ে বিএসইসির ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। বাস্তব অবস্থা হচ্ছে, যেসব কোম্পানি আইপিও অনুমোদন চেয়ে আবেদন করছে, তাদের প্রায় সবার উদ্দেশ্য একই। এক্ষেত্রে আমাদেরও কিছু করার থাকে না। ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য মূলধন উত্তোলন করতে চায়— এ কারণে আইপিও অনুমোদন না করলে শেয়ার সরবরাহ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। তাতে শেয়ার চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য নষ্ট হলে সেকেন্ডারি শেয়ারবাজারে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা থাকে।
এজন্য কমিশনের পরিকল্পনা হচ্ছে, কোনো কোম্পানি ব্যাংকঋণ পরিশোধের জন্য আইপিওতে আসতে চাইলে, তাকে দেখাতে হবে ওই ঋণের অর্থ কী কাজে ব্যবহার করেছে। আমাদের কাছে যদি মনে হয়, কোম্পানিটি উৎপাদনশীল খাতে ওই ঋণ ব্যবহার করেনি, তবে তাকে আইপিও অনুমোদন দেয়া হবে না। উদাহরণস্বরূপ— কোম্পানি ৫০ কোটি টাকার ঋণের ৪০ কোটি টাকা উৎপাদন খাতে ব্যয় করলে এবং বাকি ১০ কোটি টাকা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করলে অথবা অন্য কোনো কোম্পানিকে ঋণ দিয়ে থাকলে সেক্ষেত্রে ওই কোম্পানিটি কেবল ৪০ কোটি টাকার মূলধন উত্তোলনের সুযোগ পাবে।
এদিকে আইপিও আবেদন ও চাঁদা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্রোকারেজ হাউসকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা শিগগিরই বাস্তবায়িত হবে বলে জানা গেছে। কমিশন আশা করছে, আগামী মার্চেই এ প্রক্রিয়ায় আইপিও আবেদন ও চাঁদা সংগ্রহ করা সম্ভব হবে। এজন্য চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সঙ্গে কমিশনের বৈঠক হয়েছে এবং তাদের মতামত নেয়া হয়েছে। স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশন বাস্তবায়ন কাজ শেষ হয়ে আসার প্রেক্ষাপটে ডিএসইর ব্রোকারেজ হাউসগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা যায়নি। আগামী দু-এক সপ্তাহের মধ্যে আলোচনা করা হবে। এরপর কমিশনের আইনের টু-সিসি ধারায় ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে আবেদন ও চাঁদা সংগ্রহ করতে নির্দেশনা দেয়া হবে।
বর্তমানে ব্যাংকের নির্দিষ্ট কিছু শাখার মাধ্যমে আইপিও আবেদন ও চাঁদা সংগ্রহ করা হয়। এতে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় সব বিনিয়োগকারী নিজ ব্রোকারেজ হাউসে নির্দিষ্ট ছকের আইপিও আবেদন জমা দেবেন। বিও হিসাবে ওই আইপিওর জন্য নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ জমা থাকলে বিনিয়োগকারীকে নতুন করে টাকা জমা দিতে হবে না।
ব্রোকারেজ হাউস আবেদন পাওয়ার পর সমপরিমাণ অর্থ পৃথক ব্লক হিসাবে সংরক্ষণ করবে। এরপর ব্রোকারেজ হাউস থেকে কোম্পানি সব আবেদন সংগ্রহ করবে। আইপিও শেয়ারের লট সংখ্যার থেকে আবেদন বেশি হলে বর্তমানের মতো লটারি হবে। এর পর বিজয়ী বিনিয়োগকারীদের তালিকা পেলে ব্রোকারেজ হাউস ওই বিনিয়োগকারীদের আইপিও চাঁদা কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে প্রেরণ করবে। একই সঙ্গে যেসব বিনিয়োগকারী লটারি জিতবেন না, তাদের অর্থ সঙ্গে সঙ্গেই ব্লক হিসাব থেকে বিও হিসাবে হস্তান্তর করা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here