আইপিওতে আসা সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের ‘আমলনামা’

1
3928
সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন পাওয়া একটি কোম্পানি। ইউএসএ, বুলগেরিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে ২০০৪ সালের ১৬ মার্চ সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। এরপরে বাণিজ্যিকভাবে অপারেশন শুরু করে ২০০৮ সালের ৩ মে। বিশেষ করে কোম্পানিটি ট্যাবলেট ও ক্যাপসুলের প্যাকেজিংয়ের জন্য পিভিসি ফিল্ম ও খাদ্য পণ্যের প্যাকেজিংয়ের জন্য পিপি ফিল্ম উৎপাদন করে থকে।
এ কোম্পানি বছরের পর বছর শ্রমিক ফান্ড গঠন করলেও তা শ্রমিকদের মাঝে বিতরণ করে না। নিয়মানুযায়ী ফান্ডের একাংশ বিনিয়োগও করা হয় না। অন্যদিকে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির অনুমোদন পেলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো মুনাফা করতে পারেনি সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ। ফলে এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ১ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে।
প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন পাওয়া সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের আইপিওর আবেদন শুরু হবে আগামি ৮ জুন, রোববার থেকে। দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা এই আবেদন করতে পারবেন ১‌২ জুন পর্যন্ত। অন্যদিকে প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য আবেদনের সময়সীমা করা হয়েছে আগামী ২১ জুন পর্যন্ত।
২০০৬ সালের বাংলাদেশ শ্রম আইনের সেকশন ২৪২ ধারা অনুযায়ী নিট আয়ের ৫ শতাংশহারে ফান্ড গঠন বাধ্যতামূলক। আর গঠিত ফান্ডের দুই-তৃতীয়াংশ প্রতিবছর বিতরণ ও বাকি একাংশ মুনাফাযোগ্য খাতে বিনিয়োগ করার বিধান রয়েছে। নিয়মানুযায়ী ফান্ডের একাংশ বিনিয়োগও করা হয় না। পাঠকদের উদ্দেশ্যে সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির আমলনামা প্রকাশ করা হলো।শ্রম আইন ২০০৬ সাল থেকে কার্যকর হলেও সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ ২০১১ সাল থেকে ফান্ড গঠন করে। আর গঠিত ফান্ডের টাকা শ্রম আইন অনুযায়ী বিতরণ ও বিনিয়োগ কোনোটাই করে না সুহৃদ কর্তৃপক্ষ। কোম্পানিটিতে এরইমধ্যে শ্রমিকদের জন্য ৭০ লাখ ১৭ হাজার টাকার ফান্ড জমা রয়েছে। তবে টাকা কার কাছে বা কিভাবে আছে তার কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।

তবে শ্রমিকদের জন্য ফান্ডের টাকা নিয়ে কথা হলে কোম্পানির সচিব আনোয়ার হোসেন বলেন, ভবিষ্যতে এ টাকা বিতরণ করা হবে। আর বর্তমানে ফান্ডের টাকা কোম্পানিতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ ২০০৮ সালে উৎপাদনে এলেও ২০১৩ সাল পর্যন্ত উল্লেখ করার মতো কোনো ফলাফল করতে পারে নাই। বিগত ৫ বছরে কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) ১ টাকার কাছাকাছি অবস্থান করছে। এরমধ্যে ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ ১.৪৯ টাকা ইপিএস হয়। যার পরিমাণ সর্বশেষ ২০১৩ সালে হয়েছে ১.০৯ টাকা।

কোম্পানি অর্থ সংকটের কারণে ঋণগ্রস্ত হলেও অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যাংকে এফডিআর ও লাখ লাখ টাকা দিয়ে শেয়ার কিনে রেখেছে। দেখা গেছে, ২০১২ সালের ৩০ জুন কোম্পানির গৃহীত ঋণের পরিমাণ ছিল ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা আর এফডিআরে ৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ ছিল। তবে ২০১৩ সালে এসে কোম্পানি এফডিআরের টাকা ‍তুলে নেয়।

ব্যবসায় সম্প্রসারণ ও ঋণ পরিশোধের জন্য যে কোম্পানি শেয়ারবাজার থেকে টাকা উত্তোলন করতে যাচ্ছে সেই সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ শেয়ারবাজারে ৪১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে রেখেছে। শেয়ারে বিনিয়োগ করে কোম্পানি নিয়মিতভাবে লোকসানের কবলে পড়ছে। ২০১২ সালে ৫ লাখ ৩৫ হাজার আর ২০১৩ সালে ১ লাখ ৮১ হাজার টাকা শেয়ার ব্যবসায় লোকসান করেছে সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ।

মূলধন বৃদ্ধির প্রতিফলন না পেতেই উদ্যোক্তারা কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য ২০১২ সালের ১১ মার্চ আবেদন করে। ৩১ কোটি টাকার কোম্পানিটিতে উদ্যোক্তারা মূলত ২০১০ সালের শেষের দিকে সবচেয়ে বড় ২৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা মূলধন হিসাবে যোগ করে। কোম্পানি ২০০৮ সালে উৎপাদনে এলেও ওই সময় মূলধন ছিল ৪০ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।

দেখা গেছে, ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৪ কোটি টাকা মূলধন বাড়ার পরও ঋণের পরিমাণ বাড়ে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ২ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ঋণের পরিমাণ ৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়।

কোম্পানিতে শেয়ারপ্রতি সম্পদ (পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া) রয়েছে ১২.৬৬ টাকা ও পুনর্মূল্যায়নসহ রয়েছে ১৪.১১ টাকা। যে সম্পদের পরিমাণ আইপিও পরবর্তীতে সময়ে কমে দাঁড়াবে পুনর্মূল্যায়ন ছাড়া ১১.৮৪ টাকা ও পুনর্মূল্যায়নসহ ১২.৮৪ টাকায়।

সর্বশেষ অর্থবছরে এ কোম্পানিতে মাত্র নগদ ৪ লাখ ৪৯ হাজার টাকা জমা থাকে। যা দিয়ে কোম্পানির পক্ষে ওই অর্থবছরের জন্য নগদ লভ্যাংশ দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কারণ, কোম্পানিতে ৫ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করতে গেলেও কমপক্ষে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা নগদ থাকতে হবে।

সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ উৎপাদনের ১ বছরের মধ্যে সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করে পুঁজিবাজারে আসাকে কেন্দ্র করে। যেখানে ১১ কোটি ২৬ লাখ টাকার সম্পদ বাড়ে ৯ কোটি ৫ লাখ টাকা। তবে কোম্পানির কোনো সম্পদ ইমপেয়ারম্যান্ট টেস্ট করানো হয়নি। সাধারণত: একটি কোম্পানিতে অনেক ধরনের সম্পদ থাকে যা ইমপেয়ারম্যান্ট টেস্ট হলে সম্পদের মূল্য হ্রাস পায় ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কোম্পানিতে মোট ১৬৫ জন কর্মী রয়েছেন। যাদের মধ্যে ৫৯ জন কর্মী মাসিক ৩ হাজার টাকার নিচে বেতন পান।

সৃহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজে রিটার্ন অন ইক্যুইটির (ইক্যুইটির তুলনায় মুনাফা) হার অনেকাংশে কম। সর্বশেষ অর্থবছরে পরিশোধিত মূলধনের ক্ষেত্রে মুনাফা ১০.৯ শতাংশ হলেও রিটার্ন অন ইক্যুইটি হার ৭.৭৪ শতাংশ। ৩১ কোটি টাকা মূলধনের এ কোম্পানির ইক্যুইটির পরিমাণ (মূলধন+রিজার্ভ) ৪৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

একদিকে, এফডিআর আর অপরদিকে ঋণ নেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানেন না সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) আনোয়ার হোসেন। কারণ হিসাবে তিনি বলেন, তিনি ওই সময় কোম্পানিতে নিযুক্ত ছিলেন না। এ ছাড়া ইমপেয়ারম্যান্ট টেস্ট কেন করানো হয়নি সে সম্পর্কেও তিনি অবগত নন। আর ক্যাপিটাল ইনভেস্ট করার কারণে নিট নগদ প্রবাহ কম হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। আর বর্তমানে ব্যবসায় উল্লেখ করার মতো মুনাফা করতে না পারলেও ভবিষ্যত নিয়ে তিনি আশাবাদী।

কোম্পানির ইপিএস কম হওয়ার উল্লেখযোগ্য কারণ মুনাফা কম। তবে ভবিষ্যতে মুনাফা বাড়লে ইপিএসও বাড়বে। কিন্তু বছরের পর বছর শ্রমিকদের জন্য ফান্ড গঠন করা হলেও তা বিতরণ না করা শ্রম আইন লঙ্ঘন, বলেন অধ্যাপক আবু আহমেদ।

১ কোটি ৪০ লাখ শেয়ার ছেড়ে ১০ টাকা মূল্যে ১৪ কোটি টাকা উত্তোলন করতে যাচ্ছে সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ। যে অর্থের ৪ কোটি ৩৭ লাখ দিয়ে ঋণ পরিশোধ, ১ কোটি ৮৫ লাখ দিয়ে ভবন সম্প্রসারণ, ৩ কোটি ৪১ লাখ দিয়ে প্লান্ট ও মেশিনারি ক্রয়, ৩ কোটি ৩১ লাখ দিয়ে গ্যাস জেনারেটর ক্রয় ও বাকি ১ কোটি ৪ লাখ দিয়ে আইপিও ব্যয় করা হবে। – বিশেষ প্রতিনিধি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here