আইপিওতে আসা ফারইস্টের ‘আমলনামা’

1
2463
ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ইন্ডাষ্ট্রিজ লিমিটেডের প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) আবেদন জমা নেওয়া শুরু ১৫ জুন, রোববার থেকে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা আগামী  ১৯ জুন পর্যন্ত আইপিও আবেদন জমা দিতে পারবেন।
প্রবাসী বিনিয়োগকারীরা (এনআরবি) এ কোম্পানির আইপিওতে আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত আবেদন জমা দিতে পারবেন।কোম্পানির তত্বাবধানে ঢাকা জেলা ক্রীড়া সংস্থার হলরুমে ১৫ থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের আবেদন গ্রহণ করা হবে।
কোম্পানিটিতে শেয়ারহোল্ডাররা বিনিয়োগের তুলনায় শেয়ারপ্রতি সম্পদ কম পাবেন আইপিও পরবর্তী । ২০১৩ সাল শেষে এ কোম্পানির শেয়ারপ্রতি সম্পদ দাঁড়িয়েছে ১৯.০৮ টাকা, যা আইপিও পরবর্তী সময়ে দাঁড়াবে ২০.৭৮ টাকা। বিনিয়োগকারীরা ফারইস্ট নিটিংয়ে শেয়ারপ্রতি ২৭ টাকা বিনিয়োগ করলেও ২০.৭৮ টাকা করে সম্পদের মালিক হবেন। এতে আইপিওধারী শেয়ারহোল্ডাররা শেয়ারপ্রতি ৬.২২ টাকা করে লোকসানে আর আইপিও পূর্ববর্তী শেয়ারহোল্ডাররা ১.৭০ টাকা করে লাভবান হবেন।
সর্বশেষ বছরের মতো আয়ের ধারাবাহিকতায় থাকলে আগামী অর্থবছর এ কোম্পানির মুনাফা ও শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) বাড়বে। কোম্পানিটি যে পরিমাণ মুনাফা করবে সে পরিমাণ সম্পদ বাড়বে। আর যদি লোকসান করে তবে সম্পদের পরিমাণ আরো কমে যাবে।
২০১১-১২ অর্থবছরে ফারইস্ট নিটিংয়ের নিট মুনাফা ৩৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা হলেও ২০১২-১৩ অর্থবছরে হয়েছে ২৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। আর ইপিএস ৬.১৪ টাকা থেকে কমে হয়েছে ২.৫৪ টাকা। যেখানে নিট মুনাফা ১৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা বা ৪২ শতাংশ ও ইপিএস ৩.৬ টাকা বা ৫৫ শতাংশ কমেছে। এক্ষেত্রে ইপিএস বেশি কমে যাওয়ার কারণ হচ্ছে মূলধন বাড়লেও তার প্রতিফলন না হওয়া।
ফারইস্ট নিটিং দেশের প্রথম কোম্পানি যেখানে ফ্যাক্টরিতে শ্রমিকদের বিনামূল্যে দুপুরের খাবার বিতরণ করা হয়। বর্তমানে কোম্পানিটির গাজীপুরে অবস্থিত ফ্যাক্টরিতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার শ্রমিক কাজ করে। যাদের নিয়মিতভাবে বিনামূল্যে দুপুরের খাবার বিতরণ করে আসছে কোম্পানিটি।
এ ছাড়া শ্রমিকদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ফারইস্ট নিটিংয়ের কাজের পরিবেশ ভালো ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনেক সহায়ক।

কোম্পানিটি প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে (আইপিও) অভিহিত মূল্য ১০ টাকার সঙ্গে ১৭ টাকা প্রিমিয়াম নেবে। পুঁজিবাজার থেকে কোম্পানিটি ৬৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করবে ৯১ কোটি টাকা মূলধনের এ কোম্পানি। আইপিও পরবর্তী সময়ে এর পরিশোধিত মূলধন দাঁড়াবে ১১৬ কোটি টাকা। শেয়ার সংখ্যা হবে ৯ কোটি ১০ লাখ থেকে ১১ কোটি ৬০ লাখ।

কোম্পানিটি উত্তোলিত টাকার ৫৪ কোটি বা ২০ কোটি টাকার মূলধন দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবে। এতে করে দেখা যাবে, ১৫ শতাংশ হারে শেয়ারপ্রতি ৪.০৫ টাকার ব্যয় কম ও অপরদিকে একই পরিমাণ মুনাফা বৃদ্ধি পাবে।

এদিকে কোম্পানিটি সর্বশেষ অর্থবছরে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) করেছে ২.৫৪ টাকা। এমতাবস্থায় কোম্পানিটি যদি তার মূলধনের ২০ কোটি ছাড়া ৯৬ কোটি দিয়ে আগের ধারায় মুনাফা করে, তাহলে আগামী অর্থবছরে ইপিএস বেড়ে দাঁড়াবে ২.৮০ টাকায়।

কোম্পানিটির ব্যয় হ্রাস ও মুনাফার পরিমাণ বাড়বে শুধুমাত্র সুদজনিত ব্যয় কমে যাওয়ার কারণে। এ ছাড়া কোম্পানিটির ব্যবসায় কোনো প্রসার ঘটবে না বললেই চলে। কারণ, উত্তোলিত ৬৭ কোটি টাকার মধ্যে শুধুমাত্র ১০ কোটি টাকা ব্যবসায় সম্প্রসারণে ব্যবহার করা যাবে।

উত্তোলিত অর্থের ৫৪ কোটি টাকা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করা হবে উল্লেখ করা হলেও কোম্পানিটির প্রদত্ত সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী ঋণ আছে ৪২ কোটি টাকার। কোম্পানিটিতে রিটার্ন অন ইক্যুইটির (ইক্যুইটির তুলনায় মুনাফা) হার অনেকাংশে কম।

দেখা গেছে, সর্বশেষ অর্থবছরে পরিশোধিত মূলধনের ক্ষেত্রে মুনাফা ২৫.৪০ শতাংশ হলেও রিটার্ন অন ইক্যুইটির হার ১৩.৩৪ শতাংশ। এ কোম্পানির ইক্যুইটির পরিমাণ (মূলধন+রিজার্ভ) ৪৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। যেখানে কোম্পানিটি বিগত বছরগুলোতে লভ্যাংশ সম্পূর্ণ না দিয়ে ও সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন করে রিজার্ভ বাড়িয়েছে।

ফারইস্ট নিটিংয়ের সম্পত্তি ২০১০ ও ২০১১ সালে পরপর দুইবার পুনর্মূল্যায়ন করা হয়েছে। তবে কোম্পানিটির কোনো সম্পদ ইমপেয়ারমেন্ট টেস্ট (সক্ষমতা পরীক্ষা) করানো হয়নি। সাধারণত একটি কোম্পানিতে অনেক ধরনের সম্পদ থাকে যা ইমপেয়ারমেন্ট টেস্ট করানো হলে মূল্য হ্রাস পায় ও ব্যয় বাড়ে।

২০১৩ সালে কোম্পানিটিতে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনায় যে পরিমাণ নগদ টাকা এসেছে তার চেয়ে বেশি গেছে। নিট নগদ প্রবাহ ঋণাত্মক ১ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। তবে কোম্পানিটিতে মুনাফার প্রায় সম্পূর্ণ দিয়ে প্রপার্টি, প্ল্যান্ট ও ইক্যুপমেন্ট করার কারণে মূলত নেগেটিভ হয়েছে নগদ প্রবাহ।

এ কোম্পানির শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, তাদের বছরে ২ বার মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ বোনাস ও নিয়মিত কাজ করলে প্রতিমাসে ৬০০ টাকা করে অতিরিক্ত দেওয়া হয়। তবে তারা কোনো ধরনের ফান্ডের টাকা পান না বলে জানান। কিন্তু ফারইস্ট নিটিং কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে বিতরণের লক্ষ্যে নিট আয়ের ৫ শতাংশ হারে শ্রমিক ফান্ড গঠন করছে। এ ছাড়া আইনটি ২০০৬ সালে থেকে কার্যকর হলেও ফারইস্ট নিটিং কর্তৃপক্ষ ২০১১ সাল থেকে ফান্ড গঠন করে।

১৯৯৪ সালের কোম্পানি আইন ও প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, টেক্সটাইল খাতের কোম্পানিকে কস্ট অডিট করানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু ফারইস্ট নিটিংয়ের প্রসপেক্টাসে এ ধরনের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৩০ জুনের হিসাব অনুযায়ী, ফারইস্ট নিটিংয়ের ৩১ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রয়েছে। এত টাকা ব্যাংকে থাকা সত্ত্বেও কোম্পানিটিতে ঋণের পরিমাণ রয়েছে ৪২ কোটি টাকার। যেখানে কোম্পানিটি সর্বশেষ বছরে ব্যাংকে টাকা জমা রেখে ১৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা সুদ পেয়েছে আর ঋণের কারণে ৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা সুদ দিয়েছে।

তুলনামূলক বেশি সম্মানী  নেন ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইংয়ের এমডি আসিফ মইন, পরিচালক মোহাম্মদ বিন কাসেম ও ফারজা লাজিনা। সর্বশেষ ২০১২-১৩ অর্থবছরে আসিফ মইন মাসিক ১৬ লাখ হিসাবে বার্ষিক ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা সম্মানী নিয়েছেন। চেয়ারম্যান ও মার্কেটিং পরিচালক হিসেবে ফারজা লাজিনা মাসিক ৫ লাখ ৫০ হাজার হিসাবে বার্ষিক ৬৬ লাখ টাকা ও ফেব্রিকস ডিভিশনের পরিচালক মোহাম্মদ বিন কাশেম মাসিক ৭ লাখ ৫০ হাজার হিসেবে বার্ষিক ৯০ লাখ টাকা সম্মানী নেন। এই পরিমাণ সম্মানী নেওয়া এমডি ও পরিচালকদের সংখ্যা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে নেই বললেই চলে।

ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং ১৯৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল ১৯১৩ সালের কোম্পানি আইনের অধীনে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আর বাণিজ্যিকভাবে অপারেশন শুরু করে একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর। কোম্পানিটি শতভাগ রফতানি প্রস্তুতকারক। দ্রব্য তৈরির ক্ষেত্রে কোম্পানিটি সাধারণত সূতা আমদানি করে থাকে আর বাকি সব নিজেরাই তৈরি করে।

ডলার দর ৮৩ টাকা থেকে ৭৭ টাকায় চলে আসায় শেষ বছরে মুনাফা কম হয়েছে বলে জানান কোম্পানিটির এমডি আসিফ মইন। ঋণ পরিশোধকে কেন্দ্র করে আইপিওতে আসা সম্পর্কে বলেন, ৩ বছর আগে ব্যবসা সস্প্রসারণের জন্য বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসার কথা ছিল। কিন্তু বুক বিল্ডিং বন্ধ ও আইপিওতে আসতে দেরি হওয়ায় ওই সময় ঋণ নিয়ে ব্যবসায় প্রসার ঘটানো হয়। আর সেই ঋণ পরিশোধের জন্য এখন আইপিওতে আসতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত ঋণ ৪২ কোটি টাকা থাকলেও চলতি অর্থবছরে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান কোম্পানিটির ইস্যু ম্যানেজার আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টের চিফ অপারেটিং অফিসার রুবায়েত ফেরদৌস। যা আইপিওতে উত্তোলিত অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা হবে বলে তিনি জানান।

ব্যাংকে যে টাকা আছে তা ব্যবহারের জন্য নয় বলে জানান কোম্পানিটির সচিব এমএস জামান। পণ্য রফতানি ও কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে গেলে ব্যাংকে কিছু দিনের জন্য টাকা জমা থাকে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া বিএসইসির ঘোষণার কারণে দুইবার পুনর্মূল্যায়ন করলেও ইমপেয়ারমেন্ট টেস্ট করার মতো কোনো সম্পদ নেই বলে জানান এমএস জামান।

এদিকে শ্রমিক ফান্ডের টাকা বিতরণ করা হয় না শ্রমিকদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন কোম্পানি সচিব। তার মতে, শ্রমিকদের দুই ঈদে শতভাগ বোনাসসহ ফান্ডের টাকা বিতরণ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ইন্টারনাল কস্ট অডিটর দিয়ে কস্ট অডিট করানোর কথা জানান তিনি। আর কোম্পানির এমডি বিশেষায়িত ব্যাংকার হওয়ায় তাদের সম্মানী বেশি। শুধু এমডি নন শ্রমিকসহ অন্যদের বেতন ও মজুরিও বেশি বলে জানান কোম্পানি সচিব।

বিশেষ প্রতিনিধি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here