আইপিওতে আসছে ‘আমান কটন, আমান সিমেন্ট ও আমান টেক্স’

0
5766

রফিকুল ইসলাম; আমান গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৮৪তে পারিবারিক ব্যবসা দিয়ে কর্মজীবন শুরু। পরবর্তীতে দ্রুতই হয়ে ওঠেন বড় শিল্পোদ্যোক্তা। বর্তমানে গ্রুপের একটি কোম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। ভবিষ্যতে গ্রুপের সব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসা হবে। আপাতত আমান কটন ফাইব্রাস, আমান সিমেন্ট ও আমান টেক্স নিয়ে কাজ চলছে।

গড়ে তোলেন প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য, কৃষি, তৈরি পোশাক, আবাসন, সিমেন্টসহ ২৩টির বেশি প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি বরাদ্দ পাওয়া আমান অর্থনৈতিক অঞ্চলে কয়েকটি ভারী শিল্প স্থাপনে কাজ করছে গ্রুপটি। দেশে ব্যবসার পরিবেশ, আমান গ্রুপের সাফল্য ও ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা নিয়ে সম্প্রতি কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন -আব্বাস উদ্দিন নয়ন

  • অল্প সময়ের মধ্যেই আমান গ্রুপের সফলতার মূল কারণ কী?

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মানুষের মৌলিক চাহিদা ও গুণগত মানের বিষয়টি চিন্তা করে পরিকল্পনা ঠিক করছে আমান গ্রুপ। শুরু থেকেই মানুষকে সর্বোচ্চ মানের পণ্য ও সেবা দেয়ার পরিকল্পনাটা খুব দৃঢ় ছিল। সময়ের চাহিদার আলোকে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও সত্ভাবে কাজ করার কারণে কখনো আমাদের পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। অন্ন, বস্ত্র ও বাসস্থান— এ তিনটি মৌলিক চাহিদাকে কেন্দ্র করে ব্যবসা প্রসারই সফলতার মূল কারণ।

আমি দেখেছি, সময়ের পরিবর্তনে মানুষের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রযুক্তির সমন্বয় করতে পারলেই ব্যবসায় সাফল্য আসে। আর এ সফলতার সঙ্গে বড় ভূমিকা রেখেছেন আমার দুই ভাই মো. শফিকুল ইসলাম, তৌফিকুল ইসলাম ও ছেলে তরিকুল ইসলাম। পাশাপাশি সাফল্যের অংশীদার আমান গ্রুপের কর্মীরা।

  • দেশে ব্যবসার পরিবেশ, আমান গ্রুপের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাই

বাংলাদেশে ব্যবসার পরিবেশ এখন যথেষ্ট ভালো। যে কেউ চাইলে এখনো বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের ব্যবসায় উদ্যোগ নিতে পারেন। অবকাঠামো খাতে আগামী ১৫-২০ বছর অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। তৈরি পোশাক শিল্প ও আবাসন— এ দুটোর চাহিদাও ভালো থাকবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বাজার বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে।

বিশ্বের অনেক দেশের মানুষই আয়ের বড় অংশ সঞ্চয়ের চিন্তা করলেও আমাদের দেশের মানুষ খরচ করতে পছন্দ করে। আমাদের পরিকল্পনা খরচকে ঘিরেই। গুণগত মান ঠিক রেখে এখানে পণ্য ও সেবা দিতে পারলে ব্যবসা দাঁড় করানো বেশ সহজ।

আমান গ্রুপ শুরু থেকেই মানুষের মৌলিক প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করেছে। বর্তমানে তৈরি পোশাক, আবাসন, কৃষি উপকরণ, প্রক্রিয়াজাত কৃষি, ফিড, সিমেন্টসহ অবকাঠামো খাতে আমরা ব্যবসা করছি। ভবিষ্যতে স্টিল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, বেভারেজ, ওষুধসহ ভারী শিল্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের আমান অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে আমাদের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এ গ্রুপে ১৬ হাজার কর্মী কর্মরত। ২০২১ সালের মধ্যে ৩২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করছে আমান গ্রুপ।

  • ভারী শিল্প নিয়ে আমান গ্রুপের পরিকল্পনা কী?

ভারী শিল্প নিয়ে আমাদের বড় পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশে এখনো এ ধরনের বেসিক শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে সিমেন্টসহ কয়েকটি খাতে আমরা সফলতা দেখেছি। স্টিল কারখানা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। শিগগিরই আমরা ফুড ও বেভারেজ ধরনের পণ্য উত্পাদনে যাব। ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা চিন্তা করে একটি মিক্সড ফুড আইটেম আনার কথাও ভাবছি।

  • নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের ব্যবহার ও এতে বিনিয়োগের বিষয়ে

চলতি বছরের ১৬ মার্চ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আমান ইকোনমিক জোনের চূড়ান্ত লাইসেন্স দেয়া হয়। এ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা মূলত ভারী শিল্প স্থাপন করা। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ১৫০ একর এলাকা নিয়ে গড়ে তোলা আমান ইকোনমিক জোনে এরই মধ্যে আমান সিমেন্ট মিলস, আমান প্যাকেজিং, আমান শিপ ইয়ার্ড, আমান ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, একিন ফিড, আমান গ্রিন এনার্জিসহ আরো কয়েকটি কারখানা স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে।

আমাদের লক্ষ্য নিজেরা ৫০ শতাংশ জমি ব্যবহারের পাশাপাশি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বাকি ৫০ শতাংশ জমি ছেড়ে দেয়া। এরই মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরসহ কয়েকটির সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। এখানে ২০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি ১০ লাখ মানুষ পরোক্ষ সুবিধাভোগী হবে।

  • বাংলাদেশে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আমান গ্রুপ কীভাবে তার পণ্যের মান ঠিক রাখছে?

আমাদের দেশের মানুষ একটা সময় গুণগত মান নিয়ে ভাবত না। তখন প্রাপ্তিটাই মূল বিষয় ছিল। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। সক্ষমতা বাড়ার কারণে মানুষ এখন গুণগত মানটা সবার আগে দেখে। আমরা শুরু থেকেই গুণগত মান ঠিক রেখে প্রাইসিংয়ের চিন্তা করেছি। বর্তমানে আমাদের সব কারখানায় উন্নত প্রযুক্তির পরীক্ষাগার রয়েছে।

দেশের বড় প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবাই নিজস্ব পরীক্ষাগার স্থাপন করেই পণ্যের মান ঠিক রাখছে। তবে সরকারি পরীক্ষাগারগুলো আরেকটু সক্রিয় হলে মান নিয়ে মানুষের এত ভাবতে হতো না। গুণগত মানের বিষয়টিকে নিজেদের দায়িত্ব হিসেবেই অ্যাড্রেস করেছে আমান গ্রুপ। সরকার ব্যবসা করার জন্য নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। আর পণ্যের মান ঠিক রাখা আমাদেরই কাজ।

  • কারখানা স্থাপনের পর অনেক উদ্যোক্তাই কাঁচামালের উৎস নিয়ে সমস্যার কথা বলেন। এক্ষেত্রে আপনাদের অভিজ্ঞতা কী?

শিল্পের কাঁচামাল সংগ্রহ নিয়ে এখনো অনেক সমস্যা রয়ে গেছে। সিমেন্টের ক্লিংকার, জিপসাম আমদানি করতে হয়। পোশাক খাতের কিছু কাঁচামাল দেশে হলেও বেশির ভাগই বিদেশ থেকে আনতে হয়। ফিড কারখানাগুলোর সিংহভাগ কাঁচামাল বৈদেশিক উৎস থেকে আসছে, স্থানীয় কিছু কাঁচামাল ব্যবহূত হলেও সেসবের মান নিয়ে দুশ্চিন্তা রয়েছে। ফিড তৈরিতে ট্যানারির বর্জ্য ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।

আমান ফিডকে এজন্য কাঁচামাল ক্রয়ে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। সেজন্য আমাদের বাড়তি খরচও করতে হয়। আশার কথা হচ্ছে, বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে। ক্রমান্বয়ে দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসছে। ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের কাঁচামাল উত্পাদনে এপিআই শিল্প পার্ক হচ্ছে।

  • দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতি প্র্রশংসিত হলেও কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শিল্প মালিকরা প্রায়ই দক্ষ মানবসম্পদ না পাওয়ার কথা বলেন। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?

এটা সত্য যে, দেশে শিক্ষিত জনশক্তির কর্মসংস্থান আমরা করতে পারছি না। সাধারণ স্নাতকোত্তর শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। সে তুলনায় বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়ান তৈরি হচ্ছে না। শিল্পোদ্যোক্তারা এখনো তাদের প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদেশ থেকে টেকনিশিয়ান নিয়ে আসছেন। আমি বলব, শিক্ষার বিষয়বস্তুতে কারিগরি বৈচিত্র্য ও যৌক্তিকতার দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নজর দিতে হবে গুণগত মান ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণেও। আমান গ্রুপ এ বিষয়ে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

‘কাজ করি দেশ গড়ি’— এ স্লোগান নিয়ে ২০২১ সালের মধ্যে ৩২ হাজার দক্ষ কর্মী তৈরির প্রয়াস রয়েছে আমাদের। এরই মধ্যে আমরা একটি কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন বিভাগ চালু করেছি। নিজের কর্মীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি এ বিভাগ ভবিষ্যতে শিক্ষিত যুবসমাজকেও দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে সহায়তা করবে।

  • বর্তমানে আমান ফিড নামে আপনাদের একটি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত রয়েছে। গ্রুপের অন্য কোম্পানিগুলো নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

সত্যি কথা বলতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি নির্ভর করে কতগুলো বিষয়ের ওপর। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের মানসিকতা ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এর মধ্যে অন্যতম। শেয়ারবাজারে যাওয়া মানে হলো কোম্পানির স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আমাদের একটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা হলো গ্রুপের সব কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে নিয়ে আসা। আপাতত আমান কটন ফাইব্রাস, আমান সিমেন্ট ও আমান টেক্স নিয়ে কাজ করছি।

আমান কটন ফাইব্রাসকে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত হতে বিডিংয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। তালিকাভুক্তির পর থেকেই আমান ফিডের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা রয়েছে। আমরা প্রতি বছর ৩০ শতাংশ হারে লভ্যাংশ দিয়ে আসছি। তাছাড়া শেয়ারের বাজারমূল্যও বেশ স্থিতিশীল। ভবিষ্যতে তালিকাভুক্ত হলে অন্য কোম্পানিগুলোও ভালো করবে।

  • দেশের ফিড শিল্প ও আমান ফিড নিয়ে কিছু বলুন

আমাদের দেশে ফিডের চাহিদা ও সরবরাহের পার্থক্য অনেক। বর্তমানে ফিড শিল্পের বার্ষিক টার্নওভার ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা প্রতি বছর ১০-১২ শতাংশ হারে বাড়ছে। এ শিল্পের মোট মার্কেট শেয়ারের মধ্যে আমান ফিডের রয়েছে ৫ শতাংশ। আমরা এটিকে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে কাজ করছি। অন্য দেশের তুলনায় আমাদের প্রোটিন গ্রহণের হার খুবই কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুসারে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে বছরে ৩৬ কেজি প্রোটিন খেতে হয় অথচ বাংলাদেশে জনপ্রতি পোলট্রি মিট গ্রহণের পরিমাণ গড়ে সাড়ে চার কেজি।

২০৩০ সাল নাগাদ একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রোটিন গ্রহণের পরিমাণ ৪৫ কেজি এবং বাংলাদেশে জনপ্রতি পোলট্রি মিট গ্রহণের পরিমাণ ১১ কেজিতে পৌঁছাবে। তাছাড়া ডিম গ্রহণের পরিমাণও ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, যা বর্তমানে জনপ্রতি বছরে ৫৭টি। উন্নত বিশ্বে এটা ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি। এসব বিবেচনায় আমাদের দেশে পোলট্রি ফিশারির বাজারও অনেক বড় হওয়ার সুযোগ আছে। সেই সঙ্গে ফিডেরও।

চলতি বছরের প্রথমার্ধে একিন ফিড লি. নামে আমান ফিডের একটি সহযোগী কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে আমান ফিডের ৪৯ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। আশা করা যায়, আগামী বছর প্রতিষ্ঠানটি বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করবে। এর বাইরে পণ্যের মানোন্নয়ন ও কারখানার দক্ষতা বাড়াতে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। সূত্র: বণিক বার্তা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here