অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন ছাড়া কোম্পানির লভ্যাংশ নয়

1
965

স্টাফ রিপোর্টার : ব্যালান্স শিটে অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন ছাড়া সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য বীমা কোম্পানির লভ্যাংশ প্রদানে অনুমোদন দেবে না বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সংস্থাটি। এর আগে ২০১২ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে প্রতিটি বীমা কোম্পানিতে অ্যাকচুয়ারিয়াল বিভাগ খোলার নির্দেশ দিয়েছিল আইডিআরএ। তবে এখন পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ বীমা কোম্পানিতে বিভাগটি খোলা হয়নি। শিগগিরই এ বিষয়ে কোম্পানিগুলোকে আবার চিঠি দেয়া হবে বলে আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে।

এদিকে দেশে অ্যাকচুয়ারি তৈরির উদ্যোগ হিসেবে ৫০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেছে আইডিআরএ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা বিষয়ে পড়ার সুযোগ এরই মধ্যে তৈরি হয়েছে। শিগগিরই বেশ কয়েকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বীমা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হবে বলে আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে আইডিআরএ সদস্য কুদ্দুস খান বলেন, আইন অনুযায়ী এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। বীমা তহবিলের ৯০ শতাংশের মালিক বীমাগ্রহীতারা। বাকি ১০ শতাংশ বিনিয়োগকারীদের দেয়া যেতে পারে। তবে এজন্য অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন বাধ্যতামূলক। এটা না হলে শেয়ারবাজারে বীমা কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের জন্য লভ্যাংশ দেয়া হবে আইন অনুযায়ী অবৈধ।

অ্যাকচুয়ারি সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা এজন্য কাজ করছি। দেশে কিছু অ্যাকচুয়ারি রয়েছেন। অনেকেই এ বিষয়ে পড়াশোনা করতে চান। তবে এক্ষেত্রে বীমা কোম্পানিগুলোকেও আকর্ষণীয় সুবিধা প্রদান করতে হবে।

অ্যাকচুয়ারি মূলত বীমা কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি ও দায় মূল্যায়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, প্রডাক্ট ডিজাইন, লাইফ ফান্ড, গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারের মুনাফা ও লভ্যাংশ নিরূপণ করে থাকেন। অথচ দেশে বীমা কোম্পানির জন্য অনুমোদনপ্রাপ্ত অ্যাকচুয়ারি আছেন মাত্র দুজন। আর সরকারি বীমা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বীমা একাডেমিতে ভারতের একটি অ্যাকচুয়ারিয়াল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

দেশে বর্তমানে তিনজন সনদপ্রাপ্ত অ্যাকচুয়ারি আছেন। তারা হচ্ছেন— বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এম শেফাক আহমেদ, জীবন বীমা করপোরেশনের বোর্ড চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসেন ও প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাফর হালিম। এর মধ্যে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর ভ্যালুয়েশনের জন্য এতদিন সোহরাব হোসেনই আইডিআরএ থেকে অনুমোদন নিয়েছিলেন। তবে সম্প্রতি জাফর হালিম এ বিষয়ে আইডিআরএ থেকে অনুমতি নিয়েছেন।

এম শেফাক আহমেদ ও মো. সোহরাব হোসেন যথাক্রমে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে জড়িত থাকায় তাদের সামনে অনেক কোম্পানি নিজেদের ব্যবসায়িক গোপনীয়তা তুলে ধরতে চায় না। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের বিদেশে যেতে হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রেও বিপত্তি। কারণ বিদেশী অ্যাকচুয়ারি নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েকটি শর্ত আরোপ করেছে। যেমন বিদেশী কোনো অ্যাকচুয়ারি দ্বারা নিরীক্ষা কার্য সম্পন্ন করতে হলে অবশ্যই বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে। বেতনভাতা ও অন্য আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে।

নিয়োগপ্রাপ্ত অ্যাকচুয়ারিকে সম্পদ মূল্যায়নের জন্য যথাযথ সময় দিতে হবে। প্রতিবেদন জমা দেয়ার সময় অ্যাকচুয়ারিকে উপস্থিত থাকতে হবে। প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর কোনো কারণে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের তলব করা মাত্র অ্যাকচুয়ারিকে হাজির হতে হবে। ভবিষ্যতে আর্থিক অবস্থা নির্ণয়ে অ্যাকচুয়ারি তার নিজস্ব মতামত কোম্পানির ব্যবস্থাপনার কাছে অবগত করবে এবং প্রতিবেদনটি আইডিআরএর কাছে জমা দিতে হবে। সর্বোপরি কোম্পানির অ্যাকচুয়ারিকে প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকায় কাজ করার জন্য আইডিআরএর লিখিত অনুমতি নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জীবন বীমা করপোরেশনের চেয়ারম্যান অ্যাকচুয়ারি সোহরাব উদ্দিন বলেন, অ্যাকচুয়ারি ইনস্টিটিউট তৈরির আগে দেশে অ্যাকচুয়ারি তৈরি করতে হবে। তাই এ বিষয়ে অল্প যেসব ছেলেমেয়ে পড়ছে তাদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে বিদ্যমান কোম্পানিগুলোকে। এজন্য প্রতিটি বীমা কোম্পানিতে অ্যাকচুরিয়াল ডিপার্টমেন্ট থাকা উচিত।

জানা গেছে, বিদেশী অ্যাকচুয়ারি নিয়োগে আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে অধিকাংশ কোম্পানিই অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন ছাড়াই সাধারণ বীমাগ্রহীতাদের লভ্যাংশ প্রদান করছে। এমনকি কোম্পানির অর্থ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ খাতেও বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তাই সাধারণ বীমাগ্রহীতা ও গ্রাহকদের স্বার্থেই অ্যাকচুয়ারিয়াল ভ্যালুয়েশন বাধ্যতামূলক করছে আইডিআরএ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শেখ কবির হেসেন বলেন, আইডিআরএর এ উদ্যোগ অবশ্যই বীমা খাতের জন্য ইতিবাচক। তবে সবার আগে দেশে অ্যাকচুয়ারি তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী অ্যাকচুয়ারিয়াল সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করছেন, তাদের কাজের সুযোগ করে দিতে হবে দেশের বীমা কোম্পানিগুলোতে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here