শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি নিয়ে ডিএসইর কারণ দর্শানোর নোটিশ যেন বিনিয়োগকারীদের মরার উপর খড়ার ঘাঁ। এর সুযোগ বোঝে একটি চক্র সময় বোঝে নির্দিষ্ট কোম্পানির শেয়ারের দর বৃদ্ধিতে উঠে পড়ে লাগে। সাধারন বিনিয়োগকারীরা এই খেলায় সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেন দাম বাড়তে থাকা শেয়ার থেকে নিজেদের মুনাফা হাতিয়ে নেয়ার। ঠিক সে সময়ই ডিএসই কোম্পানিটির শেয়ারের দর বাড়ার কারণ অনুসন্ধানে নামে।

চক্রটি যখন নোটিশের চিত্র প্রত্যক্ষ করে তখনই চলে খেলা। কার আগে কে বেরিয়ে যাবে, আর মুনাফার হিসাবে কার কত যোগ হবে। মাঝে সাধারন বিনিয়োগকারী যারা মুনাফার আসায় শেয়ার ক্রয় করেছিল তারা থাকেন হতাশায়।

গেল জানুয়ারী থেকে অদ্যবধি প্রায় ১৫টি কোম্পানিকে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির দায়ে নোটিশ করেছে ডিএসই। কিন্ত দেখার বিষয় হচ্ছে, নোটিশ করা হচ্ছে এমন সময় যখন শেয়ারের দর সর্বোচ্চ পর্যায়ে। আর যখনই নোটিশের জবাব ডিএসই প্রকাশ করছে তখনই দর ক্রমাগতভাবে কমতে থাকে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা উচিত। দর বৃদ্ধির যদি কোনো কারণ না তাকে তাহলে কেন ক্রমাগত দর কমছে তারও নোটিশ দেয়া উচিত। তাহলে বাজার সম্পর্কে বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছ ধারনা পাবে।

ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী জানান, এটি ডিএসইর নিয়মিত কার্যক্রম। যখনই কোনো কোম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিক পর্যায়ে আসে তখনই ডিএসই বিনিয়োগকারীদের সচেতনতার অংশ হিসাবেই এ উদ্যোগটি গ্রহন করে। তবে দর কমার বিষয়েও উদ্যোগ নেয়া হলে এটি বাজারকে প্রভাবিত করবে। কারণ যখন কোনো কোম্পানি তার নেতিবাচক তথ্য বাজারে প্রকাশ করে কিংবা আর্থিক তথ্য প্রচার করে তখন স্বাভাবিকভাবে সেই কোম্পানির শেয়ারের দর আরো কমতে থাকে। তবে বাজার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে যৌক্তিকভাবে দর কমার কারণটিও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

চলতি জানুয়ারী মাসের ২১ তারিখে অস্বাভাবিক দর বাড়ার কারনে নোটিশ করা হয় ঢাকা ডায়িংকে। জবাব যথারীতি একই। কোন মূল্য সংবেদনশীলত তথ্য অপ্রকাশিত নেই। একই ভাবে নোটিশ করা হয়েছে অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, আইটি কনসালটেন্টস, ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডসহ সিএমসি কামাল। কিন্ত এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা কতটা উপকৃত হচ্ছেন এ প্রশ্নে অভিযোগের শেষ তাদের।

বাজার বিনিয়োগকারী আজমল হোসেন জানান, ডিএসই মনিটরিং সিস্টেমে এটি স্পষ্ট করেই বোঝা যায় কোন কোম্পানির শেয়ার কতদিন ধরে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ঐ কোম্পানির কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ইতোপূর্বে ডিএসইতে আছে কি নেই। না থাকলে দুদিন পরেই নোটিশ করা উচিত। তা না করে ডিএসই পাঁচদিন কোনো সময় আরো বেশি সময় অতিক্রম হলে কোম্পানিকে নোটিশ করে। এর মধ্যে ঐ শেয়ারের দর আশাচুম্বি হয়ে যায়। নোটিশ করার পর বাজারে ইন্সাইডার টেডিংয়ের মাধ্যমে আগেই কারসাজিকারীরা বেরিয়ে যায়। ফলে ক্রমাগত কমতে থাকে শেয়ারের দর। মাঝে লোকসান গুনতে হয় সাধারন বিনিয়োগকারীদের।

ঢাকা ডায়িং কোম্পানির গেল পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠে এই কোম্পানির শেয়ারের দর। তারপর এই দর বৃদ্ধি চলে টানা ১১ কার্যদিবস। তারপর করা হয় দর বৃদ্ধির নোটিশ। কোম্পানিটির ডাটা চিত্রে দেখা গেছে, মূলত এই সময়ের পর থেকেই কমেছে কোম্পানির শেয়ারের দর। কোম্পানির পক্ষ থেকে যথারীতি উত্তর আসার পর গেল দুই মাসে এই কোম্পানির সর্বোচ্চ দর উঠেছে ১৪ টাকা। সর্বশেষ লেনদেন এসে ঠেকেছে ১২.৮০ টাকায়।

২০ জানুয়ারী একই কারণে নোটিশ করা হয় অলটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডকে। এর আগে ১২ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র ১ দিন বাদে প্রতিদিনই বেড়েছে শেয়ারের দর। এ সময়ে শেয়ারটির দর ১৬ টাকা ৮ পয়সা থেকে বেড়ে ২৯ টাকা ৯ পয়সা পর্যন্ত হয়। অর্থাৎ শেয়ারটির দর বেড়েছে ১৩ টাকা ১ পয়সা বা ৭৭ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

১৩ জানুয়ারী নোটিশ করা হয়েছে আইটি কনসালটেন্টস লিমিটেডকে। নোটিশ করার আগে ৩ কার্যদিবসের প্রতিদিনই শেয়ারটির দর বেড়েছে। এ সময়ে শেয়ারটির দর ৪৭ টাকা ৭ পয়সা থেকে বেড়ে ৫৬ টাকা ৮ পয়সা পর্যন্ত হয়। অর্থাৎ শেয়ারটির দর বেড়েছে  ৯ টাকা ১ পয়সা বা ১৯ শতাংশ। ন্যাশনাল হাউজিংকে একই কারণে নোটিশ করা হযেছে ১২ জানুয়ারি। নোটিশ করার আগে ১৮ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র ৬ কার্যদিবস শেয়ারটির দর কমেছে। বাকি ১২ কার্যদিবসে শেয়ারটির দর ২৮ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ টাকা। কিন্ত নোটিশের উত্তর ডিএসইতে প্রচারের পর থেকে অদ্যবধি পতনেই আছে কোম্পানিটি। বর্তমানে লেনদেন হচ্ছে ৩২ টাকায়। সংকার বিষয় হচ্ছে ৪৪ টাকা লেনদেন হওয়ার পর ৪৩টি কার্যদিবস পার করেছে কোম্পানিটি। অদ্যবধি শেয়ার প্রতি দাম ৪৪ টাকার ঘর অতিক্রম করতে পারেনি। উল্লেখিত টাকায় যেসব বিনিয়োগকারী এ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করেছে তাদের বর্তমানে শেয়ার প্রতি লোকসান হচ্ছে ১২ টাকা।

অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধির জন্য ১০ মার্চ নোটিশ করা হয় সিএমসি কামাল। মোট ৫১ কার্যদিবসের হিসাবে দেখা গেছে ১৭ কার্যদিবস কোম্পানিটির শেয়ারের দর কমেছে। তবে এর মধ্যে ৩৪ কার্যদিবস শেয়ারের দর বেড়েছে। দর বাড়ার ধারাবাহিকতায় দেখা গেছে ১২ টাকার শেয়ার গিয়ে ঠেকেছে ২৩ টাকায়। প্রায় দ্বিগুন দাম বাড়ার পর নোটিশ করা হয় কোম্পানিটিকে। ১০ মার্চের পর থেকেই শেয়ার প্রতি দাম কমছে।
একে বারে মন্দায় পরে থাকা ওরিয়ন ফার্মা লিমিটেডের শেয়ার দর হঠাৎ বাড়তে থাকে। ডিএসইর পক্ষ থেকে নোটিশও দেয়া হয়। জবাব, কোনো রকম মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারটির দর বাড়ছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, এর আগে ৫ কার্যদিবসের প্রতিদিনই শেয়ারটির দর বেড়েছে। এ সময়ে শেয়ারটির দর ৩৫ টাকা ২ পয়সা থেকে বেড়ে ৩৯ টাকা ৩ পয়সা পর্যন্ত হয়। অর্থাৎ শেয়ারটির দর বেড়েছে ৪ টাকা ১ পয়সা বা ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এ বিষয়ে জিএসপি ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের প্রধান কারিগরি কর্মকর্তা দেবব্রুত কুমার সরকার জানান, এটি ডিএসইর নিয়মিত কার্যক্রম। কিন্ত যে সময়টিতে কোম্পানিকে নোটিশ দেয়া হয় তা অযৌক্তিক। কারণ নোটিশ তখনই দেয়া হয় যখন শেয়ারটির দর সর্বোচ্চ পর্যায়ে।

সাধারন বিনিয়োগকারীরা স্বাভাবিকভাবে মুনাফার আশায় এসব শেয়ারে বিনিয়োগ করে। তাদের পরে আর মুনাফা পাওয়া সম্ভব হয় না। নোটিশ করার ক্ষেত্রে হঠাৎ করে শেয়ারের দর কমছে তারও এটি নোটিশ হওয়া উচিত। তিনি বলেন, কোম্পানির পক্ষ থেকে যথারীতি একটি উত্তর বাজারকে স্থিতিশীল করতে পারে না। মন্দ এবং ভাল উভয় উত্তরই বাজার বিনিয়োগকারীদের কোম্পানি সম্পর্কে ধারনা দিতে পারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here