অস্থির ডলারের বাজার, আমদানির নামে অর্থ পাচারের আশঙ্কা

0
210

বিশেষ প্রতিনিধি : বাড়ছে পণ্য আমদানি ব্যয়। বাড়ছে ডলারের দাম। এই মুদ্রা বাজারের অস্থিরতার কারণ খুঁজতে ও বাজার স্বাভাবিক করতে বাণিজ্যিক ব্যাংক অনুমোদিত ডিলার (এডি) ও মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এরপরও বাজারে স্থিতিশীলতা আসছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলসি খোলার ক্ষেত্রেও কিছুটা কড়াকড়ি আরোপ করা প্রয়োজন। কে কোনো পণ্য আমদানি করছেন। এলসি খোলার সঙ্গে আমদানি পণ্যের সামঞ্জস্য আছে কিনা এসব বিষয়ে অধিক যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সম্প্রতি দেশের পণ্য ও সেবা উভয়ের ক্ষেত্রেই বেড়েছে বাণিজ্য ঘাটতি। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) মোট বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩২০ কোটি ২০ লাখ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পণ্য ও সেবা খাতে প্রচুর পরিমাণ আমদানি ঋণের দায় পরিশোধ হচ্ছে। তাই সামগ্রিকভাবে এক ধরনের টান সৃষ্টি হয়েছে ডলারের বাজারে।

চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) পণ্য আমদানিতে ৫ হাজার ৫৯৫ কোটি ডলারের ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে ব্যয় বেড়েছে ২ হাজার ২৮ কোটি ডলার বা ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে বেশিরভাগই আমদানি হচ্ছে শিল্পের কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী যন্ত্রপাতি। অথচ এ খাতে আমদানি বাড়লেও শিল্প স্থাপন, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে না।

এ ছাড়া এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল এবার ১৪০ কোটি ডলারে উঠেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদে আকুর বিল ১৫৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে উঠেছিল।

আগে আমদানির পরিমাণ কম এবং রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলোয় বাড়তি ডলার থাকত। ওইগুলো তখন বাংলাদেশ ব্যাংকে বিক্রি করে দিত ব্যাংকগুলো। ফলে বাড়ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ।

বর্তমানে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স বাবদ যা আসছে, তা দিয়ে আমদানি ব্যয় মেটানো যাচ্ছে না। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে ডলার দিতে হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ১০ মাসে (২০১৭ সালের ১ জুলাই থেকে ৩ মে পর্যন্ত) বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ১৯৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার কিনেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ডলারের দাম নিয়ে কেউ কারসাজি করেছে বা করছে এটা যদি চিহ্নিত হয়ে থাকে, তাহলে সবার আগে সে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থা আরো জোরদার করতে হবে।

এদিকে চলতি বছরের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণত নির্বাচনী বছরে অর্থপাচার বেড়ে যায় ব্যাপক হারে। সেই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমে যায়। অতীতের বেশ কয়েকটি নির্বাচনী বছরের রিজার্ভের স্থিতি বিশ্লেষণ করে এমনটাই দেখা গেছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়।

গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সির (জিএফআই) সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর গড়ে ৭৫১ কোটি ৫০ লাখ ডলার অবৈধ পথে বাংলাদেশের বাইরে চলে গেছে। ওই ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় ২০১৩ সালে নির্বাচনের বছরটিতে। সে বছর ১ হাজার ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার পাচার হয়।

বাংলাদেশ ইনস্টিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে অর্থ পাচার, যার ৮০ শতাংশই হচ্ছে ব্যাংকের মাধ্যমে। আমদানি-রপ্তানিতে পণ্য ও সেবায় ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিং; আমদানি-রপ্তানিতে বহুমাত্রিক ইনভয়েসিং; পণ্য ও সেবা সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনা, একইভাবে শিপমেন্টের ক্ষেত্রেও ওভার এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমেও অর্থ পাচার হচ্ছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here