অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নবদিগন্ত

0
766
 অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নবদিগন্ত

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ এবং এ সম্পর্ক চার দশক অতিক্রম করেছে। মজার বিষয় হচ্ছে, যারাই বাংলাদেশে শাসনক্ষমতায় এসেছেন, সবাই চীনকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়েছেন। শুরুতে হয়তো চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ধরনটা অনেকটাই ছিল কূটনৈতিক ও সামরিক বিষয়কেন্দ্রিক। পরবর্তীতে এ ধরনে পরিবর্তন ঘটেছে, প্রাধান্য পেয়েছে অর্থনীতি-বাণিজ্য। ধীরে ধীরে চীন একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে গত শতকের আশির দশকে চীনে আধুনিকায়ন শুরু হলে দেশটি অনেকটাই এগিয়ে যায়।

পরবর্তীতে স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পরে বিশ্বে বাজার অর্থনীতির দাপট শুরু হয়। বলতে গেলে, বিশ্বায়নের নামে বাজার অর্থনীতির সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে বিস্তার ঘটলে এর সবচেয়ে বড় সুফলভোগী হয় চীন। ফলে চীনের প্রভূত উন্নতি ঘটে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়তে থাকে দেশটির এবং চলতি শতকের শূন্য দশকের শুরু থেকে চীন দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখে। বলা যায়, ২০০৬-০৭ সালের দিকে চীন বিশ্বে অন্যতম অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ক্রয়ক্ষমতা সাম্যের (পিপিপি) দিক থেকে এখন বিশ্বের সর্ববৃহত্ অর্থনীতি চীন।

বলা বাহুল্য, চীন আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ সুসম্পর্ক তৈরি করেছে। এ সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো অর্থনীতি। আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ চীনের সাহায্য, ঋণ কিংবা অর্থায়নে অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নতি করেছে। সেখানে সমুদ্রবন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেতু ও বড় ধরনের বিদ্যুেকন্দ্র সবই চীনের সাহায্যে করা হয়েছে। প্রায় অর্ধযুগ ধরে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় থাকায় বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের ক্রমবর্ধমান অবকাঠামো চাহিদা মেটানোর সামর্থ্য তাদের নেই। এ সুযোগটি নিয়েছে চীন। এতে দেশটি নিজে যেমন শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি অন্য রাষ্ট্রকেও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে সহায়তা করেছে।

সার্বিক পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, প্রথাগত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ততার পাশাপাশি বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে বাংলাদেশে চীনের উপস্থিতি বেড়েছে। সম্প্রতি চীন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে, যেটি কয়েক দশক ধরে ভারতের দখলে ছিল। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের একটা ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্পর্ক এরই মধ্যে বিরাজমান। তার সঙ্গে যেক্ষেত্রে চীনের অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থা আছে সেটি হলো— অবকাঠামো উন্নয়ন মডেল। লক্ষণীয়, আমরা অর্থনীতির একটা পর্যায়ে এসেছি। দীর্ঘদিন ধরে একটা স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি অর্জন করে আসছি। এ প্রবৃদ্ধির বণ্টন নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রশ্ন থাকলেও সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর সুফল নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

আলোচ্য প্রবৃদ্ধির ফলে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল আছে। সামগ্রিক উন্নয়নের জায়গায়ও একটি বজায়যোগ্য পর্যায়ে রয়েছি। এরই মধ্যে বলতে শুরু করেছি, আমরা মধ্যম বা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছি এবং আমাদের মাথাপিছু আয় এখন প্রায় দেড় হাজার ডলার। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরে ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে অবকাঠামো উন্নয়নের, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভোগের। পুঁজিবাদী বা বাজার অর্থনীতিতে এটা খুবই স্বাভাবিক এবং আলোচ্য অর্থনীতিতে এটি একটি চক্র। এ চক্রে জনগণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমাদের ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দরকার। আবার অবকাঠামো চাহিদা মেটানোও প্রয়োজন। উভয় দিক থেকে আমরা লক্ষ করছি, চীনই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি সুযোগ প্রদান করতে পারে। চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্কটা এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠিত এবং তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন চাহিদা পূরণের সক্ষমতা। আলোচ্য সক্ষমতার দিক থেকে বিশ্বের যে কয়টি দেশ বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় চীন।

কারণ চীনের অর্থ নিয়ে শুধু বাংলাদেশের নয়, আগেই বলেছি আফ্রিকার দেশগুলোরও ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। চীনের অর্থ মিয়ানমারে ব্যাপকভাবে কাজ করছে। আসিয়ান দেশগুলো গ্রহণ করছে চীনের অর্থ। বড় বিষয়, চীনের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অর্থনীতি সচল রাখছে। ফলে চীনের প্রতি সব রাষ্ট্রেরই এক ধরনের আকর্ষণ আছে। বাংলাদেশের থাকাটাও স্বাভাবিক। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের পরীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আছে। চীনের সঙ্গে একক কোনো রাজনৈতিক দলের যে বিশেষ সম্পর্ক, সেটিও এখন নেই।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। শুরুর দিকে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সীমিত অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। বলা যায়, ছোট কিছু অবকাঠামো প্রকল্পের সঙ্গে চীনের অন্তর্ভুক্তি ছিল। চীন আমাদের আমদানি বা রফতানি বাণিজ্যে অতটা দৃশ্যমান ছিল না। সেটা আশি ও নব্বইয়ের দশকে। কিন্তু চলতি শতকের শূন্য দশকে বাংলাদেশের সঙ্গে চীন দ্রুত অর্থনৈতিক সম্পর্কের চিরায়ত চিত্রটা পাল্টে দিয়েছে। সেটি এমন সময়ে পাল্টিয়েছে, একদিকে চীন দ্রুতগতিতে বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ধাবিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রথাগত অর্থনৈতিক শক্তিগুলো যেমন— যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যের অনেকটা অবনমন ঘটছে। আবার বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। আমাদের অর্থনীতিতে উদারীকরণ হয়েছে। অর্থনীতির চাহিদা বেড়েছে। এ পর্যায়ে আমাদের বড় অর্থনৈতিক শক্তির সাহায্য আরো বেশি প্রয়োজন। সেদিক থেকে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে আরো সম্পৃক্তি বাড়ানোটাই কাম্য।

লক্ষণীয়, বাংলাদেশ-চীনের অর্থনৈতিক সম্পর্কের তিনটা প্রধান স্তম্ভ রয়েছে। এক. সাহায্য। এ বিষয়টি একসময় বাংলাদেশের জন্য খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এখন সেটি অত গুরুত্বপূর্ণ নয়। দুই. বাণিজ্য। বাণিজ্যের জায়গায় চীন খুবই স্বাভাবিকভাবে ভারতকে টপকে বাংলাদেশের এক নম্বর বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত হয়েছে। তিন. বিনিয়োগ। এটি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অতীতে লক্ষ করেছি, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, কানাডা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের আরব আমিরাত এসব রাষ্ট্র এককভাবে বিনিয়োগে বেশ এগিয়ে ছিল। কিন্তু অর্ধদশক থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন অনেক এগিয়ে এসেছে। আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে আছি, যেখানে বাংলাদেশে অবকাঠামোর জন্য ৫০ বিলিয়ন ডলারের যে বিনিয়োগ প্রয়োজন, তার একটা বড় অংশ চীন জোগান দিতে পারে। চীন তেমন প্রস্তুতি ও সদিচ্ছা দেখাচ্ছেও।

চীনের প্রেসিডেন্টের চলমান সফরে জানতে পেরেছি, দেশটির পক্ষে ২০ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়া সম্ভব। বলা যায়, ২০২১ সালের মধ্যে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ কিংবা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে যে খাতগুলোয় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটি কেবল চীনের পক্ষেই করা সম্ভব। সে জায়গা থেকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কটা একটা প্যারাইডাইম শিফটের মধ্যে আছে। পোশাকপণ্য রফতানির জন্য আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নকে গুরুত্ব দিই, আবার আমদানির জন্য ভারত ও চীনকে গুরুত্ব দিই। আমরা এখন গড়ে ৬ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছি। তবে প্রবৃদ্ধির হার ৮ বা দুই অংকে নিয়ে যেতে চাইলে আমাদের যে ধরনের অবকাঠামো চাহিদা আছে, তা পূরণে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে মনে হয় না এ বিনিয়োগের জন্য আমাদের সামনে চীনের চেয়ে সক্ষম কোনো রাষ্ট্র আছে। এটিই হলো বাস্তবতা।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের জায়গা থেকে অর্থনৈতিক কূটনীতির একটা নতুন দিগন্তে আমরা আছি। প্রশ্ন হলো, সাহায্য-বাণিজ্য-বিনিয়োগের মাধ্যমে যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং সেটাকে আরো ব্যাপকতর করার যে বাস্তব সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে, তা আমরা কীভাবে কাজে লাগাব? সেখানে আমাদের চ্যালেঞ্জগুলো কী, সেদিকে প্রথমে দৃষ্টি দিতে হবে। চ্যালেঞ্জ নিয়ে বসে থাকলে হবে না। সেক্ষেত্রে প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক কিংবা অন্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনৈতিক সম্পর্কের জায়গায় এক মুহূর্ত অপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ। এক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অর্থনৈতিক পরাশক্তির কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার জন্য অনেক দেশই মুখিয়ে আছে। আমরা সুযোগগুলো কাজে না লাগালে অন্য দেশ তা লুফে নেবে। কাজেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্রুত নেয়া এবং সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য যে আমলাতন্ত্রের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা উচিত। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে দ্রুত কাজ করার চেষ্টা করলেও সামষ্টিকভাবে এগিয়ে নেয়ার যে প্রক্রিয়া বা ব্যবস্থা, তাতে দীর্ঘসূত্রতা থেকেই যাচ্ছে। আলোচ্য ব্যবস্থায় আমাদের দেশের অর্থনীতির এ মুহূর্তে যে চাহিদা এবং চীনের মতো রাষ্ট্রগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত করার যে ধরনের স্মার্টনেস ও ক্যাপাসিটি দরকার, তা নেই। বিভিন্ন দেশ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখায় দুর্নীতি আর লালফিতার দৌরাত্ম্য। দুর্নীতি বন্ধ করতে না পারার বড় কারণ সদিচ্ছার ঘাটতি।

চীনের প্রেসিডেন্টের সফর বাংলাদেশের বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর সঙ্গে নতুন প্রকল্পের ব্যাপারে সম্মত হয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়টিরই ইঙ্গিত দেয়। আমরা জানি, আমাদের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গিয়েছিলেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় চীনের প্রেসিডেন্ট আসছেন।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নয়, আবার অভ্যন্তরীণও বটে। কারণ এটা বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চীনের যে অংশগ্রহণ, সেটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত থেকে শুরু করে বহির্বিশ্বে আমাদের শক্তিশালী অংশীদার, উন্নয়ন সহযোগী বা বন্ধু যারা আছে, তাদের অনেকেই বিষয়টিকে কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক মনোভাব থেকে দেখছে। এক্ষেত্রে তাদের এক ধরনের সংশয়, এক ধরনের বঞ্চনাও কাজ করতে পারে যে, তারা যুক্ত হতে পারছে না; অন্য রাষ্ট্র যুক্ত হচ্ছে। মানে চীন যুক্ত হচ্ছে। এটা অনেকটা কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।

এ চ্যালেঞ্জ বাইরে থেকে এলেও তা মোকাবেলা বা সমাধানের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকার বা রাষ্ট্রের। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অত্যন্ত দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। কারণ বাংলাদেশ কোনো রাষ্ট্রের জন্য হুমকি নয়। এমনকি পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্র, যেটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রতিনিয়ত হস্তক্ষেপ করে যাচ্ছে, বাংলাদেশের আত্মমর্যাদায় আঘাত করছে, তাদের জন্যও নয়। তারা একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিচার প্রক্রিয়ায় যুদ্ধাপরাধীর বিচার করলেও তাতে হস্তক্ষেপ করতে চাইছে। এত কিছুর পরও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক থাকবে এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে থেকে বাংলাদেশ আচরণ করবে। বাংলাদেশ একটি শান্তিপ্রিয় রাষ্ট্র।

আমরা সবসময় চাই, একটি শান্তিপ্রিয় বিশ্ব। বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের সদস্য। বাংলাদেশ এনপিটি, সিটিবিটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। বাংলাদেশ নারী অধিকার সম্পর্কিত যেসব আন্তর্জাতিক সনদ আছে, তাতে স্বাক্ষর করেছে। এছাড়া অ্যান্টি-মানি লন্ডারিংসহ অপরাধ দমনমূলক যে বিশ্ব প্রক্রিয়া, সেসবের সঙ্গে বাংলাদেশ যুক্ত। ফলে আঞ্চলিক পর্যায়ে, দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে বা বিশ্বপর্যায়ে কোনো রাষ্ট্রের বিপক্ষে যাওয়ার নীতি বাাংলাদেশের নেই। গত এক দশকের পররাষ্ট্রনীতি দেখলে অন্তত তা-ই স্পষ্ট হয়।

এখন বিশ্বে স্নায়ুযুদ্ধের মতো কোনো পরিস্থিতি নেই। কাজেই বাংলাদেশে যদি চীন ব্যাপকভাবে উন্নয়নে সহায়তা করে, সেটি অন্য কোনো রাষ্ট্র বা উন্নয়ন অংশীদারের জন্য মাথাব্যথার কিংবা ভীতির কারণ হতে পারে না। কোনো রাষ্ট্রের এটিকে কূটনৈতিক ইস্যু হিসেবে বাংলাদেশের সামনে তুলে ধরা এবং উদ্বেগ মনে করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। নিশ্চয়ই সে চিন্তাকে বাংলাদেশের সরকার প্রশ্রয় দেবে না। কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জায়গায় বাংলাদেশ যে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রাখছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে।

নিঃসন্দেহে আমাদের সহায়তাকারী প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট রয়েছে। সেটি বাংলাদেশের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। তাদের দিক থেকে বড় গুরুত্বের জায়গা হলো, বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র। দেশটি অতিদ্রুত যখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে, তখন এখানে সাত থেকে আট কোটি মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিশ্বের যেকোনো বহুজাতিক কোম্পানির লাভজনক ব্যবসার অন্যতম বড় ক্ষেত্র।

ফলে প্রতিটি রাষ্ট্র, যাদের সঙ্গে আমরা এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা ভাবছি, তারা সবাই তাদের নিজেদের সুবিধা নেয়ার বিষয়টি দেখছে। তারা বর্তমান বাংলাদেশকে দেখছে না। তারা দেখছে ১০, ২০ বছর পরের বাংলাদেশকে। যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে এবং সেটাকে আরো বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চায়, তারা ভবিষ্যত্ বাংলাদেশকে দেখছে। ফলে আজকে চীন, ভারত, জাপান যারাই আসছে, তারা বাংলাদেশের সম্ভাবনাটা ভালোভাবে পরিমাপ করেই আসছে।

তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো, আগ্রহী দেশগুলোর সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। অনেক দেশে এখন কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই নেই। বাংলাদেশে বিদ্যমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী যেকোনো ধরনের কাজ করতে প্রস্তুত। চীন যেভাবে উন্নত হচ্ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে— চীনের জনগণ হোয়াইট কলার কাজ চায়, আরো আরামদায়ক জীবনে অভ্যস্ত হতে চায়। সেখানে শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠার সুযোগ সীমিত হয়ে আসছে। কাজেই বাংলাদেশে শ্রমঘন শিল্পগুলোয় চীন সহায়তা করলে আমাদের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য বিরাট সুযোগ সৃষ্টি হবে।

ফলে চীনের প্রেসিডেন্টের সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কে যে একটা নতুন অধ্যায় সূচিত হতে যাচ্ছে এবং অর্থনৈতিক কূটনৈতিক জায়গা থেকে তারা বাংলাদেশে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে, বাংলাদেশেরও সেগুলো বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি ভারতসহ আমাদের সহযোগিতা করতে আগ্রহী অন্য রাষ্ট্রগুলোকেও আশ্বস্ত করা উচিত যে, তাদের মধ্যে কোনো অমূলক উদ্বেগ থাকলে সেটি অপ্রয়োজনীয়, ভিত্তিহীন। বিশ্বের সব দেশই উন্নত হতে চায়। উন্নত শূন্য থেকে হওয়া যাবে না। যেহেতু বিশ্বে একটি আন্তঃনির্ভরশীল অর্থনীতি বিরাজ করছে, যেহেতু আমরা একটি বিশ্বায়নের অর্থনীতিতে বাস করছি, সেখানে আমাদের অন্য রাষ্ট্রের অর্থ গ্রহণ করতে হবে। এবং তা যতটা সম্ভব সহজ শর্তে নেয়া উচিত। কিন্তু শর্তের নামে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলে তা আমরা হারাব, অন্য রাষ্ট্র সেটি গ্রহণ করবে।

যেমন— স্যামসাং কয়েক বছর আগে ২০ বিলিয়ন ডলারের বড় বিনিয়োগ করতে চেয়েছিল বাংলাদেশের টেলিকম সেক্টরে। বাংলাদেশ সে সুযোগ দিতে পারেনি। পরে ভিয়েতনামে কোম্পানিটি তাদের প্লান্ট তৈরি করে। সেখানে এখন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যবসা হচ্ছে। ভিয়েতনামের অর্থনীতির চাকা বদলে যাচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার একটা কোম্পানি কীভাবে একটা দেশের চেহারা পাল্টে দিচ্ছে, সেটা অভাবনীয়। চীনসহ সব সক্ষম রাষ্ট্রকে আমাদের স্বাগত জানানো উচিত। কূটনৈতিক বিবেচনা কিংবা কোনো পক্ষের জন্য উন্নয়ন প্রলম্বিত করা টেকসই নীতি হতে পারে না। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পৃক্তি আরো জোরদার হোক— এটাই প্রত্যাশা।

  • ড. দেলোয়ার হোসেন, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here