প্রতিযোগীতায় পেছনে পড়ছে ইস্টার্ন কেবলস, কমেছে মুনাফা

0
551

সিনিয়র রিপোর্টার : পণ্যের গুণগত মান ভালো। তবুও বেসরকারি প্রতিযোগীদের সঙ্গে অবস্থান ধরে রাখতে পারছে না। পেছনে সরে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত কেবল প্রস্তুতকারক কোম্পানি ইস্টার্ন কেবলস লিমিটেড। তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বিক্রি ৩২ ও নিট মুনাফা প্রায় ৮৩ শতাংশ কমেছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দরবৃদ্ধি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের বিক্রয় নীতিমালা ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতার কারণে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদির ক্রমবর্ধমান বাজারেও ইস্টার্ন কেবলস পিছিয়ে পড়ছে। তারা বলেন, পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ক্রেতা-অবান্ধব নীতিমালা, প্রচারণায় সীমাবদ্ধতা ও গ্রাহকসেবার দুর্বলতায় কোম্পানির বিক্রি কমছে।

ইস্টার্ন কেবলস পিভিসি ইনসুলেটেড সিঙ্গেল ও ডাবল কোরের ডমেস্টিক কেবল, পাওয়ার কেবল ও বিভিন্ন ধরনের অ্যালুমিনিয়াম কেবল তৈরি করে। এসব পণ্য উত্পাদনে কাঁচামাল হিসেবে ৯ দশমিক ৫ এমএম অ্যালুমিনিয়াম ওয়্যার, ৮ এমএম কপার ওয়্যার, পিভিসি রেজিন, ডপ, স্টিল ফ্ল্যাট ওয়্যার ও স্টিল স্ট্রিপ ব্যবহার করতে হয়।

আন্তর্জাতিক বাজারে অ্যালুমিনিয়াম ও কপার ওয়্যারের দর বাড়লেও ইস্টার্ন কেবলসের পণ্যের দাম বাড়েনি। কোম্পানি সচিব মো. শফিকুল ইসলাম দাবি করছেন, মূলত এ কারণেই ইস্টার্ন কেবলসের মুনাফা কমেছে।

তিনি বলেন, ইস্টার্ন কেবলস বাংলাদেশ, জার্মান ও ব্রিটিশ মেট্রিক স্ট্যান্ডার্ডে তিন ধরনের কেবল উৎপাদন করে। আমাদের পণ্যের মান অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভালো। তবে বিক্রি কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে কোম্পানির মুনাফা কমেছে।

এদিকে বিক্রি ও মুনাফা কমে যাওয়ার পেছনে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির চেয়ে সরকারি নীতিমালা ও প্রতিযোগিতায় বেসরকারি কোম্পানির এগিয়ে যাওয়াকেই বেশি দায়ী করছেন কোম্পানিটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ যুগে গ্রাহকদের সর্বোত্তম সেবা দিয়ে বিক্রি বাড়াতে হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনলে ডিলার-গ্রাহক কেউই বেসরকারি কোম্পানির মতো সেবা পান না।

বেসরকারি কোম্পানিগুলো তাদের ডিলার ও গ্রাহকদের ২৪ ঘণ্টার সেবা দিয়ে থাকে। প্রচার মাধ্যমে সরব উপস্থিতি তাদের পণ্যকে সবার কাছে পরিচিত করে তোলে। অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পণ্যের মান ভালো হলেও তারা সেবা ও প্রচারে অনেক পিছিয়ে।

বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) তথ্যমতে, ২০১২-১৩ হিসাব বছরের পর থেকে ইস্টার্ন কেবলসের বিক্রি কমছে। ধীরে ধীরে কমছে কোম্পানিটির উৎপাদনও। ২০১২-১৩ সালে ইস্টার্ন কেবলসের মোট বিক্রি ছিল ১৫৫ কোটি ১২ লাখ টাকা। পরবর্তীতে তা ধারাবাহিক কমে ২০১৩-১৪ সালে ১১৩ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ সালে ১১১ কোটি ৫০ লাখ ও সর্বশেষ ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে ১০৫ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমে এসেছে।

এর বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে উৎপাদনও কমিয়েছে ইস্টার্ন কেবলস। ২০১২-১৩ সালে ১২৪ কোটি টাকার পণ্য উত্পাদন করলেও তিন বছরের ব্যবধানে তা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। ২০১৫-১৬ হিসাব বছর শেষে এর মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

এদিকে উৎপাদন ও বিক্রি কমার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কোম্পানির মূল কাঁচামাল অ্যালুমিনিয়ামের দর বেড়ে যাওয়ায় ইস্টার্ন কেবলসের বিপদ আরো বেড়ে যায়। তিন বছরের ব্যবধানে কোম্পানির মুনাফা কমেছে ৮২ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ২০১২-১৩ সালে কোম্পানিটির নিট মুনাফা ছিল ২০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এর পর ধারাবাহিকভাবে কমে ২০১৩-১৪ সালে ১৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, ২০১৪-১৫ সালে ১০ কোটি ৭৬ লাখ ও সর্বশেষ ২০১৫-১৬ হিসাব বছরে তা ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকায় নেমে গেছে।

কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উষাময় চাকমা বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো প্রচার ও সেবায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় একটু এগিয়ে। তারা ডিলারদের অতিরিক্ত সুবিধা ও নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে সব মানুষের কাছে তাদের পণ্য পৌঁছে দিচ্ছেন। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে আমাদের অনেক বিধি-নিষেধ ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ কারণে আমরা প্রতিযোগিতায় কিছুটা পিছিয়ে পড়ছি। এছাড়া সরকারের বিভিন্ন অফিস তাদের ক্রয় নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় আমাদের বাজার আরো কমছে।

প্রসঙ্গত, কেবল উৎপাদনের জন্য জার্মানি থেকে আন্তর্জাতিক সনদ নিয়ে ১৯৭০ সালে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন কেবলসের কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে বাণিজ্যিক উত্পাদন শুরুর পর এর উত্পাদন সক্ষমতা ছিল ২ হাজার ৫০০ টন। পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ৭ হাজার ৩০০ টনে উন্নীত করা হলেও তা থেকে মাত্র সাড়ে ৪ হাজার টন সক্ষমতার সদ্ব্যবহার করতে পারে কোম্পানিটি।

১৯৮৬ সালে শেয়ারবাজারে আসা কোম্পানিটি কয়েক বছর ধরেই শেয়ারহোল্ডারদের ১০ শতাংশ বা তার বেশি হারে লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। ২৪ কোটি টাকা অনুমোদিত মূলধনের এ কোম্পানির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ এর উদ্যোক্তা-পরিচালকদের কাছে, বাংলাদেশ সরকারের হাতে ৫১ শতাংশ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ১৭ দশমিক ৭৪ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে বাকি ২৬ দশমিক ৬২ শতাংশ শেয়ার।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here